আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। প্রতিটি আসনেই মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন নির্বাচনী মাঠকে জটিল করে তুলেছে। চারটি আসনেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে দলের বিদ্রোহী নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বিভক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা নিতে পারে জামায়াতে ইসলামী—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তবে সব হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে রয়েছে আওয়ামী লীগের নীরব ভোটব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান প্রচারে না থাকলেও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের চারটি আসনে এবার মোট ২৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন স্বতন্ত্র। উল্লেখযোগ্যভাবে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিম তিনটি আসনে (বাগেরহাট-১, ২ ও ৩) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এছাড়া বাগেরহাট-১ আসনে মো. শেখ মাতুন রানা এবং বাগেরহাট-৪ আসনে কাজী খায়রুজ্জামান শিপন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন।
বাগেরহাট-১: সংখ্যালঘু ভোট বড় ফ্যাক্টর
চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-১ আসনে সংখ্যালঘু ভোট বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীকে পেছনে ফেলে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। তিনি মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব এবং বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি।
কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল পূর্বে চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। এই আসনে লক্ষাধিক হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাদের ভোট টানতেই বিএনপি কৌশলগতভাবে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে বিএনপির সাবেক নেতা এম এ এইচ সেলিম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাছুদ রানার উপস্থিতিতে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলের সাবেক জেলা আমির মো. মশিউর রহমান খান সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বাগেরহাট-২: ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সদর ও কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-২ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৮ হাজার। বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও আইনজীবী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ মনজুরুল হক রাহাদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন এম এ এইচ সেলিম।
স্থানীয়ভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। প্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে থাকলেও গোপনে অনেকেই সেলিমের পক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এম এ এইচ সেলিম দাবি করেন, জনগণের চাপে তিনি নির্বাচনে নেমেছেন এবং নির্বাচিত হলে দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আসনটি উপহার দিতে চান।
অন্যদিকে শেখ জাকির হোসেনের অভিযোগ, জামায়াতকে সুবিধা করে দিতেই সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। জামায়াত প্রার্থী শেখ মনজুরুল হক রাহাদ নিজের জনপ্রিয়তার ওপর আস্থা রাখলেও বিএনপির দ্বন্দ্ব তাকে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে বলে স্বীকার করেন।
বাগেরহাট-৩: আওয়ামী ভোটের অপেক্ষা
রামপাল ও মোংলা উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৩ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৪ জন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির প্রার্থী ও জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং জামায়াতের মো. আব্দুল ওয়াদুদ শেখের মধ্যে। এখানেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন এম এ এইচ সেলিম।
এই আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোট জয়-পরাজয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারের পতনের পর অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন। হামলা-মামলা, জমি ও ঘের দখল এবং চাঁদাবাজির আশঙ্কায় অনেকে ভোটকেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী।
ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, এলাকায় সন্ত্রাস দমন ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় তারা কাজ করছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ শেখ দাবি করেন, আওয়ামী লীগের পতনের পর তারা এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং দখল-চাঁদাবাজি প্রতিহত করেছেন। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় ভোটাররা তাদের সমর্থন দেবেন বলে তিনি আশাবাদী।
বাগেরহাট-৪: ঐতিহ্যগতভাবে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি
মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৪ আসনটি ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এখানে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হন। জোটগত কারণে ২০০৮ সালেও আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি।
এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সোমনাথ দে, যিনি আগে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই আসনে মোট ভোটার প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। বিএনপির বিদ্রোহী নেতা কাজী খায়রুজ্জামান শিপন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভোটে ভাঙন ধরতে পারে। এতে জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল আলীম বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
নীরব সমঝোতার রাজনীতি
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাগেরহাট জেলা সম্পাদক এস কে হাসির বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এলাকায় নীরব অবস্থানে থাকলেও বিভিন্ন প্রার্থীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা করছেন। নির্বাচনে জিততে সব পক্ষই আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছে। চার আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে চলে এসেছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বাগেরহাটের চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতটা না প্রকাশ্য প্রচারে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে ঝুঁকবে—সেই অপেক্ষাতেই এখন রাজনৈতিক মহল।
সান নিউজ/আরএ