২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ জয় ও নিজেদের মুকুট ধরে রাখার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছ আর্জেন্টিনাকে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ১৮টি ম্যাচ থেকে ৩৮ পয়েন্ট সংগ্রহ করে কেবল দক্ষিণ আমেরিকান বাছাইপর্বে শীর্ষস্থানই অর্জন করেনি, বরং পুরো টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করেছে। প্রতিপক্ষদের চেয়ে বেশ বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে টেবিলের শীর্ষে থেকে মিশন শেষ করেছে।
তবে, তাদের এই যাত্রা পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। তাছাড়া ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে হার, প্যারাগুয়ের মাটিতে পরাজয় ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ড্রয়ের মতো কিছু অপ্রত্যাশিত ধাক্কা সমর্থকদের মনে কিছুটা সংশয় তৈরি করেছিল। ৪টি পরাজয় মোটেও ছোট কোনো সংখ্যা নয়।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে তাদের ঘরের মাঠে এবং নিজেদের মাঠে উভয় লেগেই হারানোর এক পরম তৃপ্তি ছিল এই বাছাইপর্বে। প্রথমে ব্রাজিলের মাটিতে তারপর বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ৪-১ গোলের এক দুর্দান্ত জয় পায় তারা।
তবে অন্যান্য কিছু প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় আলবিসেলেস্তেরা এবার বেশ কিছু প্রশ্নচিহ্ন মাথায় নিয়ে টুর্নামেন্টে খেলতে নামছে।
মেসির দিকে বিশেষ নজর কোচ স্কালোনির
লিওনেল মেসির বয়স এই জুনে ৩৯ বছর পূর্ণ হবে । লিওনেল মেসি খুব সাধারণভাবেই বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং তর্কের খাতিরে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার। চার বছর আগে তিনি আর্জেন্টিনাকে এমন একটি বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিয়েছিলেন, যা ১৯৮৬ সালের পর থেকে দেশটির জন্য এক অধরা স্বপ্ন হয়ে ছিল।
কয়েক বছরের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপে দেখা যাবে মেসিকে।
৩৯-এর কোঠায় পৌঁছানো পরেও, মেজর লিগ সকারে ইন্টার মায়ামির হয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছেন। ২০২৫ মৌসুমে তার করা ২৯টি গোল এবং ১৬টি অ্যাসিস্ট মায়ামিকে শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেছিল; যার মাধ্যমে মেসি আবারও নিজের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। চলতি মৌসুমেও তিনি পারফরম্যান্স ও গোল—উভয় দিক থেকেই দারুণ ফর্মে রয়েছেন।
আপাতত আর্জেন্টিনার প্রাথমিক লক্ষ্যটি বেশ সহজ ও হাতের নাগালেই মনে হচ্ছে: আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্ডানকে নিয়ে গড়া গ্রুপ পর্ব থেকে পরবর্তী রাউন্ডে উত্তীর্ণ হওয়া। এরপর কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।
আর্জেন্টিনার কোচ: লিওনেল স্কালোনি
আর্জেন্টিনার এই সাফল্যের মূল কাণ্ডারি হলেন লিওনেল স্কালোনি। সাবেক এই ফুল-ব্যাকের জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কোচিংয়ের তেমন বড় কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, এর আগে তিনি কেবল সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে তার কৌশল ছিল অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট: মেসিকে কেন্দ্র করে দল সাজানো, সঠিক খেলোয়াড়দের নির্বাচন করা, দলের ভেতর একতা তৈরি করা এবং একটি সুসংহত দল গড়ে তোলা।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, জেরোনিমো রুলি ও হুয়ান মুসো; ডিফেন্ডার: লিওনার্দো বালের্দি, গঞ্জালো মন্তিয়েল, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, ফাকুন্দো মেদিনা ও নাহুয়েল মলিনা; মিডফিল্ডার: লেয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো দে পল, ভ্যালেন্তিন বার্কো, জিওভানি লো সেলসো, এসেকুয়েল পালাসিওস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ; ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গঞ্জালেস, থিয়াগো আলমাদা, জিউলিয়ানো সিমিওনে, নিকোলাস পাজ, জোসে ম্যানুয়েল লোপেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ।
সর্বশেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা
উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে তাদের সেই অপ্রত্যাশিত হারটিও এই দক্ষিণ আমেরিকান জায়ান্টদের ভাগ্য বদলাতে সাহায্য করেছিল। ওই ধাক্কাই জুলিয়ান আলভারেজ এবং এনজো ফার্নান্দেজের মতো তরুণদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছিল—যারা টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন বেঞ্চের খেলোয়াড় হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে দলের প্রধান অবদানকারী এবং নিয়মিত একাদশের সদস্য হয়ে ওঠেন। এই হার স্কালোনির শিষ্যদের আরও জাগিয়ে তুলেছিল, যার ফলে তারা দ্রুতই নিজেদের ছন্দ ফিরে পায়; যার প্রথম শিকার হয় মেক্সিকো এবং এরপর পোল্যান্ড।
নকআউট পর্বে এসে আর্জেন্টাইনরা তাদের আসল ছন্দ খুঁজে পায়, যদিও তাদের প্রতিটি ম্যাচই ছিল চরম নাটকীয়তায় ঠাসা। শেষ ১৬-র লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করার পর নেদারল্যান্ডসের সাথে ২-২ গোলে উত্তেজনাকর ড্র শেষে পেনাল্টি শুট-আউটে কোনোমতে পার পায় তারা। সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে কিছুটা স্বস্তি মিললেও, ফাইনাল ম্যাচটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্নায়ুযুদ্ধের উদাহরণ। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের আর মাত্র দশ মিনিট বাকি থাকতে আলবিসেলেস্তেরা ২-০ ব্যবধানে এবং অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিরোপা নিজেদের করে নিতে তাদের আবারও বুক ধড়ফড় করা পেনাল্টি শুট-আউটের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল।
আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
মেসি কেবল নিজের দেশের হয়েই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় শীর্ষে নন, বরং যেকোনো দেশের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ডটি তার দখলে। এই পরিসংখ্যানটি কেবল এই ফরোয়ার্ডের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রমাণই দেয় না, বরং বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার হেভিওয়েট মর্যাদাকেও ফুটিয়ে তোলে। মেসি পাঁচটি বিশ্বকাপ জুড়ে (জার্মানি ২০০৬, দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০, ব্রাজিল ২০১৪, রাশিয়া ২০১৮ এবং কাতার ২০২২) মোট ২৬টি ম্যাচে অংশ নিয়েছেন।
সান নিউজ/ জামান