বাণিজ্য

অর্থনীতিতে ‘লাল সংকেত’, জানালেন অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়, খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতের বিভিন্ন সময়ের অর্থনৈতিক সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে এসব খাতকে পুনরুদ্ধারে সরকারের নতুন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রবৃদ্ধিতে বড় পতনের চিত্র

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তার মতে, অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ

অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, সেখানে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্বল সুশাসন এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে।

রাজস্ব ও কর আদায়ে এখনও পিছিয়ে বাংলাদেশ

বাজেট বক্তৃতায় রাজস্ব আদায়ের দুর্বল দিকগুলোর কথাও তুলে ধরা হয়। অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের চাপ

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হারও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। যেখানে ২০০৫ সালে এটি ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা ঋণাত্মক অবস্থানে নেমে এসেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে ধীরগতি

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বর্তমানে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এই প্রবণতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট, ঘাটতি ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে।

এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট আয় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি সৃষ্টি হবে।

সরকার এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ, অনুদান এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

ঘাটতি মেটাতে ঋণনির্ভর পরিকল্পনা

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আরও ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

আগামী বছরের লক্ষ্য কী?

সরকার আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

উল্লেখ্য, সংবিধান ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেট প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয় এবং পরে রাষ্ট্রপতির সম্মতি গ্রহণ করা হয়।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ধরা পড়ে মাদক বহনকারীরা, সংসদে যায় কারবারিরা

মাদক মামলায় বারবার কেবল বাহক বা বহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও মূল কারবারিরা বিচারে...

দেশে গড়ে প্রতিদিন ১০ খুন, বাড়ছে ছিনতাই-ডাকাতি

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সং...

মেধাবী উদ্যোক্তারা পাবেন ৫ কোটি টাকা: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দি...

সুন্দরবনের ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর ২৭ সদস্যের আত্মসমর্পণ  

অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে কোস্টগার্ডের কাছে আত্নসমর্পণ করেছে সুন্দরবনের বনদস্যু...

জুনে সড়কে ঝরল ৪৬৩ প্রাণ, শীর্ষে চট্টগ্রাম

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত রয়েছে। গত জুন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থ...

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে রাতেও চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে রাজধানীতে দিনভর বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ ক...

সুন্দরগঞ্জে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় আমন ধানের বীজতলা ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি

টানা ভারি বর্ষণে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে...

গাইবান্ধার চরাঞ্চলে মূল্যবান ভারী খনিজ বালু আহরণের কর্মযজ্ঞ

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান ভারী খন...

‘মান্নাত’ নিয়ে আইনি জটিলতার অবসান শাহরুখ খানের 

বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ‘মান্নাত’ নিয়ে চলা আইন...

৭ বছর পর বড় পর্দায় ফিরছেন গোবিন্দ 

নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা গোবিন্দ দীর্ঘ সাত বছরের বিরতি শেষে আবারও...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা