মতামত

কয়লা ধুলে ময়লা যায় কি

গওহার নঈম ওয়ারা : মনে হয় না রামপালের গলা থেকে কয়লাবিদ্যুতের ফাঁস কেউ সরাতে পারবে। তবে এটা যে সুন্দরবনের জন্য মরণফাঁদ হবে না, সেই আশ্বাসেও বিশ্বাস রাখার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নজরে আসে না। বলা হচ্ছে রামপালের কয়লাবিদ্যুৎ আর দশটা এচিপেচি মার্কা সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এখানে সবচেয়ে আধুনিক ও নতুন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তা ছাড়া রামপাল সুন্দরবন থেকে বেশ খানিকটা দূরে। সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে পশুর নদের তীর ঘেঁষে ১ হাজার ৮৩৪ একর জমির ওপর এ প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে সাভারের দূরত্ব এমনই হবে। যদিও ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার এবং ইন্টারন্যাশনাল কনজারভেশন ইউনিয়ন (আইইউসিএন) বলেছে, এমন সম্ভাবনা খুব প্রবল যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণ সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। ইউনেসকো বলেছে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র এমন কোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া উচিত, যাতে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি না হয়।

তবে পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নমানের কয়লা রামপালে এসে কীভাবে পবিত্র কয়লা বা ক্লিন কোল হয়ে যাবে, তা অনেক বিজ্ঞানীরও মাথায় আসছে না। কয়লাকে কোন কায়দায় কচলালে তার ময়লা চলে যাবে, সালফার হাপিশ হয়ে যাবে, তা তাঁদের জানা নেই। এটাও ঠিক, সব বিজ্ঞানী সবকিছু জানেন না, জানি আমরা আর আমাদের আমলারা। বছর দুয়েক আগে ২০১৯ সালে জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী দিল্লি সফরের সময় বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমরা কিন্তু রামপালে আলট্রা সুপারক্রিটিক্যাল বা বিশেষ ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর ফলে এই সালফার বা নাইট্রাস পার্টিক্যালগুলো ট্র্যাপ করে ফেলা সম্ভব, অর্থাৎ বাতাসে সেগুলো বেরোতেই পারবে না। এসব করতে গিয়ে আমরা বাড়তি খরচ করছি, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু নো কম্প্রোমাইজ! রামপালে একেবারে ক্লিন কোল টেকনোলজি বা প্রায় সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত কয়লার ব্যবহার হচ্ছে।’

রামপালে আসার পর কয়লাকে ‘ঢিঢ’ করে সভ্য বানানো হবে, কিন্তু আসার পথে সে যদি কোনো অঘটন ঘটিয়ে দেয়, তখন কী হবে? অঘটন মানে নৌপথে কয়লা আনতে গেলে সুন্দরবনের বুক চিরেই তাকে আনতে হবে।

তাতে সুন্দরবনে যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল বাড়বে। তাদের তেল-ময়লায় নদী দূষিত হবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে সুন্দরবনের পশুর নদের প্রতি লিটার পানিতে তেলের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম (স্বাভাবিক মাত্রা হলো ১০ মিলিগ্রাম)। আর ২০১৮-১৯ সালে সেটা চলে গেছে ৬৮ মিলিগ্রামে। পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের নানা প্রজাতির, নানা আকারের জলজ প্রাণী। নৌযান চলাচল করার রুটে বনের পাশে এখন হরিণ, বানরসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর চলাচল ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছে। দেখা যায় না তাদের স্বতঃস্ফূর্ত চলাফেরা।

সুন্দরবনের নদীতে তেল আর কয়লাবাহী জলযানের ডুবে যাওয়ার ঘটনা হামেশাই ঘটে। আগের ডুবে যাওয়া জলযানগুলো কি সময়মতো উদ্ধার করা হয়েছিল? এ ব্যাপারে পরিষ্কার কোনো তথ্য কোথাও নেই। অক্টোবর ২৭, ২০১৫ সালে ৫১০ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে এমভি জিআর রাজ নামের জাহাজটি যশোরের নওয়াপাড়ায় যাওয়ার পথে সুন্দরবনের পশুর নদে ডুবে যায়। কয়লাবোঝাই জাহাজটি এসেছিল ইন্দোনেশিয়া থেকে। জাহাজডুবির পর বন বিভাগের পক্ষ থেকে পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়েছিল। তার আগে ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন ডুবে যায়।

২০১৫ সালের ৩ মে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবে যায় সারবোঝাই কার্গো জাহাজ এমভি জাবালে নূর। আর ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবতে ডুবতে অন্য কার্গোর সহায়তায় কোনোমতে মোংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় একটি কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজ। ভাসিয়ে রাখার জন্য সেই জাহাজের পেট খালি করে নদীতে কয়লা ফেলার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় বন বিভাগের তদন্ত কমিটি সুন্দরবনের ভেতর নদী দিয়ে পণ্যবাহীসহ সব ধরনের জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল। বলা বাহুল্য, বন বিভাগের কথা শোনার সময় কারও নেই।

গত বছরের মে মাসে ঘটে আরেক বুককাঁপানো দুর্ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ টন বিষাক্ত ছাইবোঝাই একটি জাহাজ ২৫ মে সুন্দরবনের প্রান্তে হাটানিয়া-দোনিয়া নদীতে ডুবে যায়। ইন্দো-বাংলা প্রটোকলের আওতায় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ২০২০ সালের মার্চ থেকে নতুন করে এ ধরনের ছাই বাংলাদেশে রপ্তানি করার কাজ চালু হয়। তখন পরিবেশবাদীরা জানিয়েছিলেন, এ ধরনের ছাইয়ে ভারী বিষাক্ত ধাতু রয়েছে, যা সুন্দরবনের প্রকৃতি এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই ছাই ভারতের কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সিমেন্ট তৈরির কারখানায় রপ্তানি করা হয়।

২০১৬ সালে ভারতের পরিবেশ আদালত কর্তৃক গঠিত একটি কমিটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাওয়া এই ছাই প্রকৃতিতে কী পরিমাণ দূষণ করে, তা নির্ণয়ের চেষ্টা করেছিল। এ বিষয়ে ভারতের একটি বেসরকারি সংস্থা লিগ্যাল ইনিশিয়েটিভ ফর ফরেস্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট জানায়, এসব কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি এক কেজি কয়লা পোড়ার পর ৩৪০ গ্রাম ছাই উৎপাদিত হয়। এ ধরনের বিষাক্ত ছাইয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি বিকিরণ ক্ষমতা রয়েছে।

জাহাজডুবির কয়লা নদীতে থাকলে কী হয়

পরিবেশ সুরক্ষাকর্মী এবং প্রকৌশলী ইকবাল হাবিবের মতে, নদীতে ডুবে যাওয়া কয়লার সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন প্রভৃতি সুন্দরবনের পানি, জীব ও বায়ুমণ্ডল দূষিত করবে। আর ক্ষতিকর মিথেন গ্যাস সুন্দরবনের শ্বাসমূল উদ্ভিদ ও মাছের প্রজননের ক্ষতি করবে।

নদীপথে, বিশেষত সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে ছাই পরিবহন নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ অবশ্যই আছে। তবে বিষয়টি নিয়ে এযাবৎ আলোচনা হয়েছে খুব কম এবং বিষয়টি নিয়ে পরিবেশসচেতন সংগঠনগুলোর তেমন হেলদোল দেখা যায় না। পানি ও জ্বালানি নীতি নিয়ে গবেষণাকারী ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী ভারত-বাংলাদেশের নৌ প্রটোকল রুট দিয়ে যত ধরনের রপ্তানি হয়, তার ৯৭ শতাংশই এই বিষাক্ত ছাই রপ্তানি। এমনকি গত এপ্রিলে (২০২০) যখন ভারতে মহামারি করোনাভাইরাসে কঠোর বিধিনিষেধ চলছিল, ঠিক সে মুহূর্তেও ২ লাখ ১২ হাজার ৮৯৮ টন বিষাক্ত ছাই বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়। আর এই প্রটোকল নৌরুটের মধ্যেই সুন্দরবন রয়েছে, যা ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্যতম স্থান নিয়ে আছে।

অন্যদিকে মৃতপ্রায় কলকাতার শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি বন্দর জাগিয়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে রামপালের জন্য নৌপথে কয়লা রপ্তানির কাজ শুরু হয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে প্রথম চালানের ৩ হাজার ৮০০ টন কয়লা এই বন্দর থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এখন থেকে প্রতি মাসে শ খানেক কয়লাবাহী জাহাজ আসবে রায়মঙ্গল-চালনা-মোংলা রুটে। এই রুটে পড়বে ভৈরব-বলেশ্বর-শিবসা-শাকবাড়িয়া-আড়পাঙ্গাশিয়া-কালিন্দী-পানগুছি-রায়মঙ্গল নদী। তাই মহাদূষণের আশঙ্কায় দুলছে সুন্দরবন।

লাঠি না ভেঙে সাপ মারার কি কোনো উপায় নেই

রামপালে কয়লা নেওয়ার জন্য রেলপথ ব্যবহারের কথা বলেছেন অনেকেই। মন্দের ভালো পথ এটা হতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রেলব্যবস্থা উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা এগিয়ে চলেছে। সেই পরিকল্পনায় এটাও যুক্ত হতে পারে। তবে কয়লার ছাই পরিবহনের জন্য সুন্দরবন নয়, অন্য কোনো কম ঝুঁকির রুট আমাদের খুঁজে নিতে হবে। ভাবতে হবে সিমেন্ট উৎপাদনে কয়লার ছাইয়ের বিকল্প নিয়ে। লাভ-লোকসানের হিসাবে পরিবেশের কথাটাও রাখতে হবে।

সুন্দরবনে জাহাজ ডুবলে জাহাজ কর্তৃপক্ষকে উদ্ধারের জন্য এক মাসের সময় দেওয়ার পুরোনো রীতি বদলাতে হবে। জলযান উদ্ধার ও দূষণ রোধের আধুনিক প্রযুক্তি বন বিভাগের নাগালে রাখতে হবে।

গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক ও গবেষক

[email protected]

সান নিউজ/এনএম

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

স্মরণকালের রেকর্ডসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম...

মরহুমা কারও থেকে ঋণ নিয়ে থাকেলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন: তারেক রহমান

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম...

মুন্সীগঞ্জে সেনাবাহিনীর অভিযানে ককটেলসহ ৩ জন আটক

মুন্সীগঞ্জ সদরের চরাঞ্চলের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের নতুন আমঘাটা গ্রামে সহিংসতা ও...

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন

বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চ...

নোয়াখালীতে প্রকাশ্যে বড় ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করলো ছোট ভাই

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আবু বক্কর ছিদ্দিক (৬৪) নামে এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে কুপিয...

মাদারীপুরে নসিমনের চাকায় পিষ্ট হয়ে মোটরসাইকেল চালকের মৃত্যু

মাদারীপুরে নসিমনের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক মোটরসাইকেল চালকের মৃত্যু হয়েছে।...

নোয়াখালীতে প্রকাশ্যে বড় ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করলো ছোট ভাই

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আবু বক্কর ছিদ্দিক (৬৪) নামে এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে কুপিয...

চিরনিদ্রায় শায়িত বেগম খালেদা জিয়া, দেশজুড়ে শোকের ছায়া

চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর এ মৃত্যুতে দেশজুড়ে বইছে শোকের ছা...

মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে যাত্রা শুরু হলো ইনোভেশন মডেল স্কুলের

কুষ্টিয়ার মিরপুরে ‘প্রাইভেট ও কোচিংমুক্ত’ শিক্ষা এবং আধুনিক প্রযু...

ঝালকাঠিতে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত

ঝালকাঠির জেলা বিএনপির উদ্যোগে বেগম খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা