ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। পাশাপাশি সাম্প্রতিক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে জনসমর্থনের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, গণতন্ত্র, সংস্কার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নানা প্রত্যাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। ত্রয়োদশ সংসদের পর কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান তারা, তা নিয়েই তাদের নানা ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে।
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রুফাইদা রহমান বলেন, “গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সরকারের চেয়ে সংস্কারকে যেনো বেশি প্রাধান্য দেয়। ক্ষমতাপ্রাপ্ত দল স্বার্থ এবং স্বজনপ্রীতির আগে সংস্কার, সমন্বয় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা। রাজনীতি যেন রাজার চেয়ে রাজ্যের সুষ্ঠতা নিশ্চিতের জন্য হয়। ত্রাসের রাজত্বের অবসান হোক, অন্যায়ের যথাযথ বিচার হোক, স্বচ্ছতা বজায় থাকুক, পরিশুদ্ধ দুর্নীতিমুক্ত পথচলা শুরু হোক, পরিবর্তনটা পজিটিভ হোক, এমন বাংলাদেশ দেখার আশা রাখি।”
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মুমতাহিনা রিনি বলেন, “নতুন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম শহীদদের রক্তের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে সমতার ভিত্তিতে। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করণ।
যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন নয়, সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। আমরা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ কমনা করি, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। একটি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ চাই, যেখানে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সমতা অটুট থাকবে।”
তিনি জানান, “এই নির্বাচন কি সত্যিই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করবে, নাকি এটিও হবে আরেকটি অপূর্ণ অধ্যায়, এটি দেখার এখনই উপযুক্ত সময়।”
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী শওকত আলম তালুকদার ইমন বলেন, “ত্রয়োদশ সংসদের পর আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ চাই। যেখানে মানসম্মত শিক্ষা, প্রশ্নফাঁসমুক্ত পরীক্ষা ও সেশনজটমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে । শিক্ষিত বেকারত্ব দূর করতে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। নিরাপদ সমাজ, নারী নিরাপত্তা ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, সকল সেক্টরে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে বিভিন্ন মৌলিক সেবা খুব সহজে হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়। সর্বোপরি একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এ প্রত্যাশা থাকবে।”
শাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক গোলাম রব্বানী বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পর এটি প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনে জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা ছিল এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী সরকার গঠিত হবে সেই প্রত্যাশাও ছিল। অপ্রত্যাশিত হলেও নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে বলে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন আসনে। তবে সকল রাজনৈতিক দল তা মেনে নিয়ে সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যা প্রশংসনীয়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন দলের নেতা কর্মীরা তাদের বিরোধী মতের মানুষের উপর জুলুম ও নির্যাতন শুরু করেছে। যা জনআকাঙ্খা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। এমন বাংলাদেশ আমরা চাইনি। আমরা চাই দেশের সকল স্তরে দল মতের শ্রদ্ধা ও গুরুত্ব থাকুক এবং সবাই নিজ নিজ আদর্শে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে তাদের কার্যাবলী সম্পন্ন করুক।”
তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দেশকে অস্থিতিশীল করে দেশের শিক্ষা ও অর্থনীতি ডুবানো হয়েছে। এখন সেই জায়গা থেকে উত্তরণের সময় এসেছে। এসব জায়গায় আমাদের বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী প্রক্রিয়ায় নজর দিতে হবে। সর্বোপরি জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া প্রায় দুই হাজার প্রাণের কাঙ্খিত বাংলাদেশ তৈরি হোক। যেখানে দল মত নির্বিশেষে সবাই নির্দ্বিধায় ও গর্বের সাথে বাংলাদেশপন্থী ও আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতি অব্যাহত রাখবে এবং বিরোধীদলের প্রতি আহবান থাকবে যে, আপনারা ছায়া সংসদ তৈরি করে সরকারি দলকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসবেন। যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছি।”
শাখা ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, “ছাত্রজনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষায় যে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল তেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। যেখানে নির্বাচন হবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের সুযোগ থাকবে পরিপূর্ণ। নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীর কাছে এ অধিকার ক্ষুন্ন হবে না। মানুষের নাগালের মধ্যেই মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হবে, দয়া হিসেবে নয় বরং প্রাপ্য হিসেবে৷ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে জ্ঞান, গবেষণা ও নৈতিকতার চর্চা প্রাধান্য পাবে। পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘর্ষের ধারা ফিরবেনা।”
তিনি উল্লেখ করেন, “দেশের অপার সম্ভাবনাময়ী যুবসমাজকে এ দেশের অগ্রগতির স্বার্থে যোগ্য করে গড়ে তোলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না এবং বাংলাদেশ হবে আধিপত্যবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ একটি দেশ। যেখানে তরুণরা নির্দ্বিধায় তাদের দেশকে গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারবে।”
শাখা ছাত্রদলের সদস্য নূর উদ্দিন বলেন, “ভোটের বাক্সের রায় কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। এটি একটি জাতির আত্মসম্মান, ন্যায়বোধ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ আর ভয়কে মেনে নিতে চায় না। তারা অধিকার, ন্যায় ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। এই আন্দোলনের প্রতিটি দিন ছিল প্রত্যাশা ও প্রতিরোধের গল্প, যেখানে সাধারণ মানুষ অসাধারণ সাহস দেখিয়েছে। ৭১-এর শহীদদের রক্তে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের মতোই, ২৪-এর শহীদরাও আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, স্বাধীনতা বারবার রক্ষা করতে হয়। তাদের ত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। সেই দায় থেকেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়।”
তিনি বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে দুর্নীতি ও দখলদারিত্বের কোনো স্থান থাকবে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কোনো নির্যাতন হবে না, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবে। নারীরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে, কোথাও ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার ভয় থাকবে না। দেশে মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশ ও সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত হবে। ভিন্নমত আর অপরাধ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ক্যাম্পাসগুলো দখলমুক্ত থাকবে, শিক্ষার্থীরা ভয়ের রাজনীতি নয় বরং জ্ঞানচর্চায় যুক্ত থাকবে। সব ধরনের নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ হবে, মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড।”
তিনি দাবি জানান, “সাজিদ আবদুল্লাহ ও হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচার নিশ্চিত হবে এবং ওয়ালিউল্লাহ মুকাদ্দাস ভাইয়ের মতো আর কাউকে গুম হতে হবে না। এমন জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আশা, ৭১ ও ২৪-এর শহীদদের ত্যাগ সব মিলিয়ে আমি এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে আইনের শাসন, মানবিকতা ও ন্যায় হবে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মাথা উঁচু করে বলতে পারবে যে, এই দেশ সত্যিই এদেশের জনগণের। এদেশের মা মাটি মানুষের।”
সান নিউজ/আরএ