বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে নির্বাচনকালীন বহিষ্কারাদেশ জারি করেছে, সেটিকে নিছক কোনো সাময়িক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বহিষ্কার স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে-দল এবার এমন এক আপসহীন অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে পিছু হটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। বিএনপির ইতিহাসে শৃঙ্খলার প্রশ্নে কঠোরতা নতুন নয়, কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা একেবারেই ভিন্নতর। এটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়; বরং দলীয় অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দর্শন রক্ষার একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কিংবা দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে কার্যক্রম চালিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদী বার্তা দিতে চেয়েছে। এই বার্তাটি মূলত দলের ভেতরে ও বাইরে এক প্রকার ‘রাজনৈতিক সার্জারি’র সংকেত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন আর ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতির ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। দলের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে উঠে কেউ নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে চাইলে তার পরিণতি যে ‘বহিষ্কার’-এবার সেটি কথার লড়াই ছাড়িয়ে বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন-উত্তর রাজনীতিতে পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব বহিষ্কারাদেশ হয়তো প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধারণা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিএনপি বর্তমানে যে ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের পুনর্বাসন করা মানে হবে দলের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করা। তৃণমূলের যেসব নেতাকর্মী হামলা-মামলা ও জেল-জুলুম উপেক্ষা করে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত রয়েছেন, বিদ্রোহীদের পুনরায় ‘আদর করে’ ফিরিয়ে আনা হবে তাদের ত্যাগের প্রতি চরম অবজ্ঞা। দলীয় নেতৃত্ব সম্ভবত অনুধাবন করছে যে, এই মুহূর্তে নমনীয়তা দেখানো হবে আত্মঘাতী।
এখানে একটি কঠিন সত্য নিহিত-রাজনীতিতে ব্যক্তি কখনোই অপরিহার্য নয়। একটি দল টিকে থাকে তার আদর্শ, সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন একটি সুশৃঙ্খল ‘চেইন অফ কমান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে, ‘দল মানেই শৃঙ্খলা, দল মানেই সিদ্ধান্তের প্রতি বিনম্র আনুগত্য’। যারা এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তাদের জন্য ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতিতে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে-এটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিবর্তন।
বিদ্রোহী প্রার্থীরা মনে করেছিলেন তাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা হয়তো দলের প্রতীক বা সিদ্ধান্তের চেয়ে বড়। কিন্তু বিএনপি এবার সেই ‘ব্যক্তি-ইমেজ’ ভেঙে ‘দলীয় সত্তা’কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার নীতি নিয়েছে। এই শুদ্ধি অভিযান কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য নয়, বরং আগামী এক দশকের জন্য একটি সংহত ও আধুনিক রাজনৈতিক শক্তির রূপরেখা তৈরির প্রক্রিয়া।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচনকালীন এই বহিষ্কারগুলো বিএনপির জন্য কোনো সাময়িক অধ্যায় নয়; এটি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা। এই বাস্তবতায় তথাকথিত ‘বিদ্রোহী রাজনীতি’র কোনো স্থান নেই, আর ফেরার পথও আগের মতো মসৃণ নয়। শৃঙ্খলার এই নতুন দেয়াল টপকানো বিদ্রোহীদের জন্য কঠিন হবে। বিএনপি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে-এবার শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ‘কম্প্রোমাইজ’ নয়। এই অনড় অবস্থানই সম্ভবত আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপির নতুন পরিচয় হয়ে উঠবে।
লেখক: এ.আর. ইমরান, কলামিষ্ট
সান নিউজ/আরএ