মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান সরকার। রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্র্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয়।
খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রীয় কার্যাবলী পরিচালনার জন্য ৩ সদস্যের একটি পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এই পরিষদে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেয়ি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আইনবিদ (ফকিহ) থাকছেন।
ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লা আলি খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে আসীন দ্বিতীয় ব্যক্তি। অ্যাসেম্বলি অব লিডারশিপ এক্সপার্টস নামে ধর্মীয় নেতাদের একটি পরিষদ খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী এটি তাদের দ্রুতই করতে হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখায় নিরাপত্তাজনিত কারণে দ্রুত ওই পরিষদের বৈঠকে বসা কঠিন হতে পারে। রুহুল্লা আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর দিনই সর্বোচ্চ নেতার পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান সরকার খামেনির মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে ৭ দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
তেহরানভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ইরনা তাদের প্রকাশিত সংবাদে জানায়, ইসরায়েলি ও মার্কিন সরকারের আক্রমণে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি শহীদ হয়েছেন। এর আগে খামেনির নিহত হওয়ার খবর জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, ‘খামেনি, ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের একজন, মারা গেছেন।’
রোয়া জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ সূত্র তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ফারস নিউজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে তার মেয়ে, জামাতা, নাতনী এবং পুত্রবধূ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে। তবে এ ব্যাপারে ইরানের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ সে সময় কোনো বিবৃতি দেয়নি।
এদিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর একাধিক ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। একাধিক সূত্র বলছে আনুষ্ঠানিক ঘোষিত উত্তরসূরি না থাকায় পরবর্তী নেতৃত্ব কে নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের নির্বাচিত আলেমদের পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। অবশ্য সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীকে ঘিরে আলোচনা চলছে।
মুজতবা খামেনি: বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার দ্বিতীয় পুত্র মুজতবা খামেনি (৫৬)। তিনি প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও তাদের স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পিতা থেকে পুত্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরকে ভালো চোখে দেখা হয় না। এছাড়া মুজতবা উচ্চপদস্থ আলেম নন এবং সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক পদেও নেই— যা তার জন্য বড় বাধা হতে পারে।
আলিরেজা আরাফি : তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও প্রতিষ্ঠিত আলেম এবং খামেনির ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত আলিরেজা আরাফি (৬৭)। তিনি বর্তমানে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের উপ-চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন, যা নির্বাচন প্রার্থী ও পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইন যাচাই করে। বর্তমানে তিনি ইরানের সেমিনারি ব্যবস্থার প্রধান। তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি খুব প্রভাবশালী নন এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণও কম।
মোহাম্মদ মেহদি মিরবাগেরি: কট্টরপন্থি আলেম হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ মেহদি মিরবাগেরি (৬০)। তিনি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধিতায় কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। বর্তমানে তিনি উত্তরাঞ্চলীয় পবিত্র নগরী কোমে অবস্থিত ইসলামিক সায়েন্সেস একাডেমির প্রধান।
হাসান খোমেনি: ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি (৫০)। পারিবারিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বৈধতার কারণে তার নাম আলোচনায় রয়েছে। তিনি খোমেনি মাজারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও তিনি কখনো জনসম্মুখে বড় কোনো সরকারি পদে ছিলেন না এবং নিরাপত্তা কাঠামো বা ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর তার প্রভাব সীমিত বলে মনে করা হয়। তিনি তুলনামূলকভাবে কম কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত।
হাসেম হোসেইনি বুশেহরি: অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের প্রথম উপ-চেয়ারম্যান হাসেম হোসেইনি বুশেহরি (৬০)। উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি খামেনির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হলেও দেশীয় রাজনীতিতে তার প্রোফাইল তুলনামূলকভাবে কম এবং আইআরজিসির সঙ্গে তার দৃশ্যমান ঘনিষ্ঠতা নেই।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতার পদ অত্যন্ত ক্ষমতাধর। সামরিক বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে নতুন নেতা নির্বাচন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নজর থাকবে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের বৈঠকের দিকে— সেখানেই নির্ধারিত হবে, কে হচ্ছেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা।
সান নিউজ/আরএ