ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিন শুক্রবার সকালে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এবং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে ।
তিনি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায়ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়নি এবং রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমাবদ্ধ থেকেছে।
তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮.২ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যয় ছিল ১১.১ শতাংশ- ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪,০৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮.২ শতাংশেই স্থির থাকে। অন্যদিকে, ব্যয়ের পরিমান বেড়ে দাঁড়ায় ১২.২ শতাংশে, ফলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪.০৫ শতাংশে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয়ের পরিমান বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলির সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। ফলশ্রুতিতে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেননি। লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত 'শ্বেতপত্র প্রণযন কমিটি'র প্রতিবেদনে বিষদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং তুলনামূলক উচ্চ সুদের ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের দায়ও বৃদ্ধি পায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে মোট সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির ৩৭.৮ শতাংশ- যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমান ছিল যথাক্রমে ১৪.৫ শতাংশ ও ২৩.৩ শতাংশ। এছাড়া, সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা। অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ সালে মোট ঋণ জিডিপির অনুপাত প্রায় একই থাকলেও অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমান দাঁড়ায় যথাক্রমে, ২১.৫ ও ১৭.১ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণের পরিমান জিডিপি'র শতাংশে কমলেও এই ঋণের একটা অংশ non-concessional বা অনেক ক্ষেত্রে Market Rate/Blended হওয়ায় দেশের Debt Sustainability এর উপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ১,১৪৭ বিলিয়ন টাকা অর্থাৎ ১৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ ঋণের উপর অধিক নির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তি কঠিন হয়েছে যাকে অর্থনীতির ভাষায় crowding out বলা হয়ে থাকে।
দেশের আমদানি-রপ্তানি, প্রবাস আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির পরিমান ছিল যথাক্রমে ১০.৫ বিলিয়ন ও ১৩.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১.৬ ও ১২.২ শতাংশ। এছাড়া, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের পরিমান ছিল যথাক্রমে ৪.৮ বিলিয়ন ও ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ সালে রপ্তানি ও আমদানি বেড়ে যথাক্রমে, ৪০.৮ ও ৬৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও এই দু'টি সূচকের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। এছাড়া, আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় রেমিট্যান্স বেড়ে ২৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ালেও হুন্ডি প্রবাহ বা অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভের পরিমান কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় (৩০.৩ বিলিয়ন ডলার), যা রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩৩.২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সর্বোপরি, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পরিমাণগত অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও গুণগত দিক থেকে ভারসাম্যহীনতা, নীতি সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় উপনীত হয়েছিল, যা থেকে উত্তরণ আজকের সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিকে তাকালে সংখ্যাটা প্রথমে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। মাথাপিছু আয়ের সংখ্যা নিয়েও বড় বিতর্ক আছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু সেই আয়ের সিংহভাগ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর হাতে।
তিনি বলেন, সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে বৈষম্য বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরীপ (হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে- এইচআইইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, আয়-ভিত্তিক জিনি কোফিশিয়েন্ট ২০০৫ সালে ছিল ০.৪৬৭। ২০০৫ এর পর থেকে এই সূচকের ধারাবাহিক অবনতি হয়ে সর্বশেষ ২০২২ সালে এসে পৌঁছায় ০.৪৯৯ পয়েন্টে। ২০০৫ সালে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ খানার আয় ছিল সবচেয়ে কম আয়ের পাঁচ শতাংশ খানার ৩৫ গুণ; ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ গুণ। ফলশ্রুতিতে একটি বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজের উত্থান হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভাতা প্রদান করা হলেও এর কাভারেজ ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিকীকরণ করা হয়নি। এতে উপকারভোগীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে, যা ক্রমান্বয়ে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচনেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে।
তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করা যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সুনিপুণভাবে করে গেছে। এর মধ্যে আমি কয়েকটির কথা উল্লেখ করতে চাই।
প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ব্যুরোক্রেসি একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি রাজনৈতিক সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিগত ১৬ বছরে এটিকে দুর্বল করে দেয়া হয়েছে।
বিগত সময়ে বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অর্থনীতির ব্যাকবোন হিসেবে খ্যাত আর্থিক খাত ধ্বংসের কিনারে এসে দাড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য দুটি সূচক সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ- শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার এবং মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি রেশিও (সিএআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই চিত্র আমূল পাল্টে গেছে- সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে। এখানে উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিক ভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে।
মূলধন পর্যাপ্ততার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে সিএআর ছিল ৭.৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ৩.০৮ শতাংশে নেমে আসে। মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো এই ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়- এটি দীর্ঘ দেড় দশকের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অনিবার্য পরিণতি।
সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম স্তম্ভ হলো রাজস্ব আহরণ। অথচ দীর্ঘদিন রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে কর আহরণের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হয়নি।
একইভাবে, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জনের একটি তথ্য বিভ্রাট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, যা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে।
বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে এ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে।
সর্বোপরি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি এমন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে বহিঃখাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একযোগে বিদ্যমান ছিল। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। উল্লিখিত চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকেই তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে দেশ পরিচালনা এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের।
বর্তমান সরকারের নিরঙ্কুশ বিজয় ও জনপ্রত্যাশা পূরণে গৃহিত/গৃহিতব্য কার্যক্রমের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তার নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচী ঘোষণা করে। যার পরিপ্রক্ষিতে জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট উৎসবের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দেশ পরিচালনায় নিরংকুশভাবে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচিত হয়েই কালবিলম্ব না করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমাদের সরকারের এক্ষেত্রে একটি অনুসৃত সামাজিক চুক্তির (social contract) প্রতিপাদ্য হলো- রাজস্ব আদায়ে আনতে হবে স্বচ্ছতা, সরকারি ব্যয়ের সুবিধাসমূহ (benefits) হবে দৃশ্যমান এবং নীতি হবে সামনে এগিয়ে চলার। এর মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে উন্নয়ন অর্থায়ন করে ঋণ নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং জনগণকে তার প্রদেয় করের বিনিময়ে সুশাসন, নিরাপদ ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করা। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জনবান্ধব করার মাধ্যমে জনগণকে কর প্রদানে উৎসাহিত করে ক্রমান্বয়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০৩৪ সালে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব প্রদান করছে, ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প ও সহজ শর্তের বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে, ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত হতে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা হ্রাস করা এবং জিডিপি'র উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা এবং ফিসক্যাল স্পেস তৈরির মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) এবং মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিএমএফ) প্রণয়নে একটি ডায়নামিক Macro-Fiscal Model উন্নয়ন করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়ন উপযোগী প্রক্ষেপন করে সে অনুযায়ী সেক্টরাল বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বানিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই লক্ষ্য করেছি যে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি পূরণে শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর, যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যমান ছিল।
তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, বিনিযোগবান্ধব পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা বাস্তবায়নে উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেয়া হচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া হবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি কর্পোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রীণ বন্ড চালু করে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজস্বের স্বাভাবিক চক্রকে সচল করার মাধ্যমে আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে।
সান নিউজ/আরএ