শিল্প ও সাহিত্য

তবুও, প্রেম (৫ম পর্ব)

সুলতানা আজীম:

(৫ম পর্বের পর----)

দেশে যেতে হলো আমাকে, জরুরী কিছু কাজে। ওর কাছে পৌঁছানোই কী সবচেয়ে জরুরী ছিলো না? দেখার নেশা। অল্প দেখা মানুষটিকেই অনেক দেখার নেশা। ‘তোমায় নতুন করে পাবো বলে’ গানটির লিঙ্ক সে পাঠালো আমাকে,আসবো জেনে। শুনলাম। বার বার শুনলাম। রোম্যান্টিসিজমে আক্রান্ত সে? কতোটা? ভাবতে ইচ্ছে করলো, হয়তো সে তেমনই হবে, যেমন হওয়া উচিত আমার সাথে? সেই মানুষটিকেই হয়তো চিনবো এবার,যাকে আমি চাই।

‘ঢাকা এয়ারপোর্টে দেখতে চাই আপনাকে।’ বাক্যটি বললাম হঠাৎ তাকে অসংযত আবেগে। প্রেম কী অধির আবেগের কিছু অধিকার তৈরী করে দেয়? আমার মতো অধিকার সচেতন মানুষকেও? আমি কী এখনও সচেতন? যা কিছু ভাবছি সচেতন ভাবে? না। আমি কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি, স্বপ্নিল অনুভ‚তি আমার? না। আমি কী চাচ্ছি? না। কেনো? চাচ্ছি না কেনো? প্রেম দিতে চাচ্ছি, পেতেও চাচ্ছি। কারণ মানুষ বাঁচে প্রেমে। কাজে নয়। তাকে খেতে হয়, সেজন্যে বাধ্য সে কাজ করতে। কাজ তাকে বিরক্ত করে। হতাশ করে। অতিষ্ঠও করে। সে কান্ত হতে থাকে কাজে। প্রতিদিন একই কাজে। প্রেম, ভালোবাসা বাঁচায় তাকে। ব্যালেন্স করে। সময় বাড়িয়ে দেয় জীবনের।

দেখা হলো আমাদের বিমানবন্দরে। নয় মাস পরে। নাহ্ তেমন সে ছিল না। মিললো না আমার প্রত্যাশার সাথে। আমার মানসিক প্র¯‘তির সাথেও। জানালো ওর কাজের ব্যাস্ততার কথা। জানালো,বিমানবন্দরে আসার কারণে কতো কতো কতো ক্ষতি হলো তার কাজের। এতো প্রিয় তার কাজ? প্রায়োরিটির দিক থেকে তা প্রথম? অবাক হলেও স্বাভাবিক থাকতেই পছন্দ করলাম। জেদি আমি তা ঠিক। কিন্তু হট টেম্পারমেন্টের মানুষ নই। রেগে সিন্ধান্ত নেই না।

অনেক কিছুই সে করলো আমার জন্যে, যা তার দায়িত্ব মনে করলো। বেশী রাতে বাইরে থাকলে বাড়ীতে পৌঁছে দেয়া। ফোন করে জানতে চাওয়া, কেমন থাকছি প্রতিদিন। দেখা হলে আমাকে খাওয়ানো রেষ্টুরেন্টে। সুখময় হলো না, তবুও দেশে থাকা দিনগুলো আমার ওর সাথে। হলো না প্রেমময়। বাড়তে থাকলো কনফ্লিক্ট। কখনো পৌঁছে গেলো তা চুড়ান্ত পর্যায়ে। ধারাবাহিক হয়ে উঠলো ওর অভিযোগ,আমার সর্ম্পকে। কেনো কাজে ব্যাস্ত থাকি এতো? দেরী করে এলাম কেনো? এখন তার আর সময় নেই আমার জন্যে। কার সাথে ব্যাস্ত ছিলাম ফোনে। এরকম অনেক ব্যাপারে। আর অন্তহীন অভিযোগ আমার, ওর অগ্রহণযোগ্য আচরণ সর্ম্পকে।

দেশে থাকা দিনগুলো কষ্টময় এমনিতেও। কোন ব্যাবস্থা এবং অবস্থা অনুকুলে নয় আমার। শিশু, অদম্য আগ্রহের বিষয়। যা কিছু পছন্দ করি, ভালোবাসি, তার মধ্যে অন্যতম শিশু। দু তিন বছরের শিশুদের রাস্তায় ভিক্ষে করতে দেখলে, মানবেতর মানুষদের জীবন দেখলে, অসহ্য হয়ে ওঠে সবকিছু। অসহ্য মনে হয় নিজের বেঁচে থাকা। পেরিয়ে গেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। অর্ধেক শতাব্দি। যথেষ্ট নয়? না কী যথেষ্টর চেয়েও অনেক অনেক অনেক বেশী। কোন একটি সমস্যা কী বলা যাবে, সঠিক সমাধান হয়েছে যার? অথবা হয়েছে কিছুটাও?

এতো এতো সমস্যার সাথে যুক্ত হলো এবার, নুতন এক সমস্যা। সমস্যাটি ভালোবাসার মানুষটির আচরণ। যার জন্যে এতো দূর আসা, কী আচরণ সে করছে আমার সাথে? বেদনা বিধ্বস্ত হয়ে নয়, শিল্পিত ভাবে যদি বলি, বলতে হবে- অভিনব অভিজ্ঞতা। অন্য কারো কী হয়েছে, এমন অভিজ্ঞতা? জানবো কী করে?

অসুস্থ হয়ে ক্লিনিকে যেতে হলো আমাকে। চেকআপ, চিকিৎসা হলো। কম হলো না ক্লিনিক বিলের পরিমান। একজন ডাক্তারও বুঝলেন না, আমার সমস্যা মানসিক। বললাম না আমিও। কথা বললাম না কোন সাইক্রিয়াটিষ্টের সাথে নিজের উদ্যোগে। যে মানসিক সমস্যা আমার, কে পারবে তার চিকিৎসা করতে? এরকম সমস্যার কথা বলবোই বা কী করে? যে দেশে কাজ করি আমি, সম্ভব হতো সেখানে। দুজনকে একসাথে এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে,মানসিক থেরাপি করতেন সাইক্রিয়াটিষ্ট। মেনেও চলতে হতো থেরাপি, চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। প্র্যাকটিস করে, আচরণ বদলে যেতো আমাদের। ভালোবাসা আর ভালোলাগার প্রলেপে, সুস্থ আর সুন্দর হয়ে উঠতে পারতো জীবন।

অনেক অনেক কিছু ঘটলো। তবুও দেশে থাকা সময়ে। পজেটিভ বলা যাবে না ঘটনাগুলোকে। বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত, দ্বিধান্বিত আমি। নাহ্, আর নয়। সরে যেতে হবেই আমাকে, এই সর্ম্পক থেকে। দেখা করি না ওর সাথে, ইচ্ছে করেই কদিন। অক্সিটোজিন কী ছেড়ে যায় আমাকে? ছেড়ে কী যায় হ্যারিকেন, টর্নাডো, ভ‚মিকম্প এবং তার প্রতিক্রিয়া? তবুও। অসহিষ্ণুতা পেরিয়ে যায় তার সবটুকু বর্ডার। উত্তেজিত সে এখন। প্রচন্ড আচরণ করে উত্তেজনায়। যা বলতে চায়নি হয়তো, বলে তাও। বলে, উত্তেজনার বেপরোয়া আবেগে। কতোটা অস্বাভাবিক সে? একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এর। নিশ্চয়ই আছে। সেটা জানার আর বোঝার, চেষ্টা করতে হবে আমাকে। বোঝাই নিজেকে আমি। আমি ভালোবাসি তাকে। এতো ভালোবাসি কেনো? না ভালোবাসলে,এতো কষ্ট পায় কেউ?

দেখা করতে হয় আমাকে ওর সাথে আবার। হেরে যাই নিজের কাছে। অক্সিটোসিনের কাছে। মধ্য রাতে ব্যাস্ত হয়ে উঠি বাড়ি ফিরতে। ‘আজ এখানেই থাকবো আমরা, ফিরতে হবে না।’ কী যে হোল আমার। কী হোল ওর? কী হলো আমাদের? কী দিলো এবং দিলো না সেই প্রবীন রাত, সে হিসেব আমি করবো না। এসেছিলো। এনেছিলো, টক ঝাল মিষ্টিতে তৈরী অন্য সময়। অনুপম রাত। মধ্য থেকে শেষ রাত। সকাল থেকে দুপুর। দুপুর থেকে সন্ধ্যে। আবার, এবং আবার। বিলীন হয়েছিলাম আমরা প্রবল প্রেমে। বলেছিলো সে আমাকে। বলেছিলো বার বার, ‘ভালোবাসি তোমাকে আমি। অনেক অনেক ভালোবাসি। যদি কোন ঈশ্বর থাকতো বুকে,সে হতে তুমি।’ সে কী তখন কেঁপে উঠেছিলো গভীরতম আবেগে? হয়তো। সে কেঁদেছিলো কেনো, তা না হলে?

ফিরে আসার আগে, দেখতে চাইলো আমাকে আর একবার। এবার কন্ঠে তার বিনীত আহবান। সময় ছিলো না একেবারেই। উপেক্ষা করবো ওকে, কেমন করে? এতো প্রেমময় সে। এতো? কয়েক ঘন্টা পরেই ফ্লাইট আমার। এয়ারর্পোটে যাবার আগে হিসেব করতে হবে যানযটের। বিরক্ত হলো না সে, আমার ব্যাস্ততায়। বললো, বার বার বললো, ‘অনেক ভালোবাসি তোমাকে আমি, অনেক। তুমি চলে যাবে আজ? কী করে কাটবে দিন আর রাত? এতো শূণ্যতা কী সহ্য হবে আমার?’ আরও কিছু বেদনাহত বাক্য,বললো সে। জল ঝরেছিলো সেদিনও তার দুচোখে। বিষন্ন হয়েছিলো তার কন্ঠ, দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকা বিচ্ছেদের বেদনায়। পরিয়ে দিয়েছিলো আমার গলায় একটি মালা। জড়িয়ে রেখেছিলো তার বুকে, পেরেছিলো যতোক্ষণ। ভরিয়ে দিয়েছিলো কোমল চুমোয়। উত্তেজনা। দিশেহারা মেজাজ। রাগ, রাগ আর রাগ। যা ইচ্ছে বলা। কিছুই আক্রান্ত করেনি তাকে, সেই সন্ধ্যায়। ভীষণ ত্যাদড় এই যুবকটিকে। কেনো? জানি এর জবাব। আজ আর এতো কথা বলবো না।’ উঠে গেলো বর্ণালী।

বিকেল থেকে সন্ধ্যে পেরুনোর মাঝে, চার বার বাথরুমে গেলো সে।

‘বায়োলজিক্যাল কোন ডিজঅর্ডার নয়তো?’ জানতে চাইলাম, ফিরে এলে।
‘ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে ভেতরে।’ বললো।
‘মেডিক্যাল হেলফ লাগবে?’ প্রশ্ন করলাম।

নিতে চাইলো না। আজ আমার বাড়িতেই থাকবে। প্ল্যান ছিলো আমাদের। ডিনারের প্রস্তুতি ছিলো। তরুণী হয়েছে এরই মাঝে, গাছের ওপরে থাকা ক্লান্ত চাঁদ। ওক পাতার আড়াল থেকে পালিয়ে আসা চাঁদের আলো যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তা বলা যাবে একটি শব্দে। অপরুপ! বারান্দাতে বসলাম এবার আমরা, ডিনারের পরে। আজ আমাদের গল্প শোনার দিন এবং রাত। গল্প নয়। বর্ণার জীবনে গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠা ঘটনা প্রবাহ। শোনার আগ্রহ ছিলো আমার। তা-ই ওর বলা।

‘অনরবত ফোন আলাপের প্রেমময় মুগ্ধতায়, টেকঅপ করলো দেশ ছাড়ার ফ্লাইটটি। টক ঝাল মিষ্টি প্রেমের স্মৃতি আর মুগ্ধ শূণ্যতায় দশ হাজার মাইলের দূরত্ব পেরুলাম মাত্র ক’মিনিটে। সান্নিধ্য অধীরতা, আবার দেখতে পাওয়ার নেশা বিভোরতায় কাটলো আমাদের কটি দিন। র্স্মাট ফোন দায়িত্ব নিলো, ‘সাত সাগর আর তেরো নদীর’ দুই পাড়ের দুটি প্রেম ব্যাকুল হৃদয়ের মধ্যে ব্যালেন্স করার। সে কী বদলে গেছে? সত্যিই? বদলেছে কী,প্রেমের গুরত্ব অনুভব করে? বদলেছে কী, আমাকে তার প্রয়োজন, তাই? এই বদলানো পজেটিভ। খুউব ভালো লাগছে আমার। হ্যাঁ, ভালোবাসি আমরা। ভীষণ ভালোবাসি।

দুটি সপ্তাহ মাত্র। ফিরে গেলো সে তার আগের চরিত্রে,আবার। চমকে উঠলাম। শুরু হলো যুদ্ধ। নিজের আবেগের বিরুদ্ধে নিজের। নিজের অনুভ‚তির বিরুদ্ধে নিজের। অভিনব এই যুদ্ধ ক্লান্ত করে তুললো আমাকে। সিন্ধান্ত নিতেই হবে এবার। যতো রক্তক্ষরণ হোক হৃদয়ে। পারছি না আর। কিসের প্রেম এটা? কি রকম আবেগ? উগ্র মেজাজ আর উত্তেজিত আচরণ, ভালোবাসা হয় কিভাবে? নাহ্ আর নয়। বন্ধ করে দিলাম যোগাযোগ। কঠিন সময়। তার জন্যে। আমার জন্যে। খুঁজছে আমাকে। খুঁজছে ব্যাকুল হয়ে। অস্থিরতায় উদভ্রান্ত সে। অনুভব করি। স্থির থাকতে হবে সিন্ধান্তে। খুন করতে হবে অবাধ্য এই প্রেম অনুভূতি। আর নয়। পেরিয়েছে আরো চার সপ্তাহ।

(চলবে----)

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

নাটোর জেলা সমিতি, ঢাকার নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় ব...

সফলতার সূত্র শেখালেন পূর্ণিমা

বিনোদন ডেস্ক: ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী পূর্ণিমা। সেই নব্বই...

শ্রীলেখার উপদেশ

বিনোদন ডেস্ক: টালিউডের লাস্যময়ী অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। ব...

টিভিতে আজকের খেলা

স্পোর্টস ডেস্ক: আজ রোববার (৫ ডিসেম্বর) টিভিতে বেশ কিছু খেলা...

সৌদি আরবে স্বামীকে মাহির উষ্ণ চুম্বন

বিনোদন ডেস্ক: সৌদি আরবের পবিত্র ম...

তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে ঝুড়ি উপচে পড়া দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ হাছান মাহ...

আফগানিস্তানে খোলা আকাশের নিচে হাজারো ক্ষুধার্ত মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে খোলা আকাশের...

বৃষ্টিতে দুর্ভোগে কর্মজীবী মানুষেরা

জাহিদ রাকিব: বৃষ্টি কারো কাছে বিলাসিতা আর কারও কাছে অস্বস্ত...

বিশ্বজুড়ে ২৩ কোটি ৯৮ লাখ সুস্থ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের তাণ্ডব...

গৃহকর্মীকে অন্তঃসত্ত্বা করলো পুলিশ 

নিজস্ব প্রতিনিধি: বগুড়ার সারিয়াকা...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা