পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোট বাইসদিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভূইয়ারহাওলা গ্রামের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভাঙাচোরা আশ্রয়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, ঝড়ে ভেঙে পড়া কোনো পরিত্যক্ত ছাউনি। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়— এটাই একটি পরিবারের শেষ ঠিকানা।
এখানেই বসবাস চারটি ছোট্ট মেয়ে সন্তান আর তাদের অসহায় বাবা-মায়ের। বহু বছর আগে কালবৈশাখীর ভয়াল ঝড়ে ভেঙে গিয়েছিল তাদের ছোট্ট ঘরটি। সেই রাতে শুধু টিন আর বাঁশ ওড়ে যায়নি, ওড়ে গিয়েছিল নিরাপদ জীবনের স্বপ্নও।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সাত থেকে আট বছর। তবু ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি পরিবারটির। বর্তমানে পুরোনো বাঁশ, ছেঁড়া পলিথিন আর জোড়াতালি দেওয়া দুটি চাল দিয়ে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করেছে তারা।
বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। ঝড় শুরু হলেই বুক কেঁপে ওঠে পুরো পরিবারের। রাতভর জেগে থাকে শিশুরা। কেরোসিনের কুপির ক্ষীণ আলোয় আতঙ্ক নিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে বসে থাকে চারটি ছোট্ট মেয়ে।
পরিবারের কর্তা গাছ কেটে ও দিনমজুরির কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালান। কিন্তু আয় এতটাই সামান্য যে খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়।
মেয়েদের লেখাপড়া করানো, ভালো পোশাক দেওয়া কিংবা নিরাপদ একটি ঘরের ব্যবস্থা করা যেন তাদের কাছে স্বপ্নেরও বাইরে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারিভাবে রাঙ্গাবালী উপজেলায় অনেক অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে ঘর দেওয়া হলেও এই পরিবারটি বছরের পর বছর অবহেলিত রয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন— তাহলে সরকারি ঘর পায় কারা? যাদের অর্থ আছে, পরিচয় আছে কিংবা প্রভাব আছে— শুধু তারাই কি সরকারি সুবিধা পাবে? আর প্রকৃত গরিব, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো কি শুধুই তালিকার বাইরে পড়ে থাকবে?
অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি পরিবার বছরের পর বছর পলিথিনের নিচে মানবেতর জীবন কাটালেও তাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি কি কখনও পড়েনি এই অসহায় পরিবারটির দিকে? নাকি কোনো অদৃশ্য কারণে তাদের ভাগ্যে জোটেনি একটি সরকারি আশ্রয়?
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এমন পরিবারগুলোকেই সরকারি সহায়তার আওতায় আনা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই সফল হবে, যখন ভূইয়ারহাওলার মতো গ্রামের অসহায় মানুষগুলোও নিরাপদে মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই পাবে।
সরেজমিন দেখা যায়, আজও কালবৈশাখীর সময়ে আকাশ কালো হলেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠে পরিবারটি। পলিথিন দুলে ওঠে বাতাসে, কুপির আলো নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়, আর চারটি শিশুর চোখে ভেসে ওঠে ভয়ের ছাপ। তখন মনে হয়— উন্নয়নের হাজার গল্পের মাঝেও, এই পরিবারটির জীবন যেন এখনও কেবল বেঁচে থাকার এক নির্মম সংগ্রাম।