সারাদেশ

কপিলমুনি মুক্ত দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিনিধি, খুলনা : আজ ৯ ডিসেম্বর খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ঐতিহাসিক কপিলমুনি রাজাকার মুক্ত দিবস। টানা চারদিন মুখোমুখি যুদ্ধের পর এই দিন বেলা ১১টায় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করে রাজাকার বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর ৪৮ ঘণ্টা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৫৫ রাজাকারের আত্মসর্মপনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ খুলনার সর্ব বৃহৎ শত্রু ঘাঁটির পতন ঘটে। ঐ দিন উপস্থিত হাজার হাজার জনতার রায়ে আত্মসমর্পণকৃতদের মধ্যে ১৫১ জন রাজাকারকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে রায় কার্যকর করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর দোসররা সারাদেশব্যাপী সাধারণ নিরীহ মানুষের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন চালাতে থাকে। আর এ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার মত জেলার পাইকগাছার সর্বত্র প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে ওঠে। এ সময় পাক দোসররা বিশাল অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘাঁটি করে ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনিতে।

অত্যাচারী বহু পরিবার সে সময় বিদেশে পাড়ি জমায়। কপিলমুনির পরিত্যক্ত বিনোদ বিহারী সাধুর সুরম্য বাড়িটি পাকিস্তানী দোসররা ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেয় এবং এলাকায় নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা এলাকায় নিরীহ মানুষেদের ধরে ক্যাম্পে এনে শরীরের বিভিন্ন অংশে কেটে লবণ দিতো। এমনকি নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে লাশ নদীতে ফেলে দিতো। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস বেশি থাকায় তাদের ওপর চলত অমানুষিক অত্যাচার ও নির্যাতন। এসব অত্যাচারের বিরুদ্ধে পাইকগাছার রাড়ুলি, বাঁকা, বোয়ালিয়া ও গড়ুইখালি মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প গড়ে তোলে।

খুলনা অঞ্চলের মধ্যে কপিলমুনির শত্রু ঘাঁটি ছিল সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। সাড়ে ৩শ’র বেশি পাকসেনা ও তাদের দোসররা এখানে অবস্থান নেয়। ছাদের ওপরে সব সময় তাক করা থাকতো ভারী অস্ত্র, কামান ও মেশিনগান। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর ক্যাপ্টেন আরেফিনের নেতৃত্বে একদল মুক্তি বাহিনী প্রথমে কপিলমুনি রাজাকারদের ঘাঁটিতে আঘাত করে। কিন্তু সুরক্ষিত দুর্গ আর রাজাকারদের শক্ত অবস্থানের কারণে সেই যুদ্ধে কোনো সফলতা পায়নি।

পরবর্তীতে পুনরায় পরিকল্পনা করে দক্ষিণ খুলনার বিভিন্ন এলাকার কমান্ডিং অফিসাররা উপজেলার রাড়ুলীর বাঁকা ক্যাম্পে এসে একত্রিত হন এবং কপিলমুনিকে রাজাকার মুক্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ঐ সময় নৌ-কমান্ডার গাজী রহমত উল্লাহ দাদু, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, স ম বাবর আলী, গাজী রফিক, ইউনুস আলী ইনু, শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু, মোড়ল আব্দুস সালাম, আবুল কালাম আজাদসহ অনেকে কপিলমুনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন।

মুক্তিযোদ্ধারা ৫টি ভাগে বিভক্ত হয়ে অবশেষে ৭ ডিসেম্বর রাতে চারিদিক থেকে কপিলমুনি শত্রু ঘাঁটি আক্রমণ করে। দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ৯ ডিসেম্বর বেলা ১১টার দিকে অস্ত্র ফেলে সাদা পতাকা উড়িয়ে ১৫৫ জন রাজাকার পাকিস্তানি দোসররা আত্মসমর্পণ করে। সঙ্গে সঙ্গে পতন ঘটে খুলনাঞ্চলের বৃহত্তর শত্রু ঘাঁটির। এই যুদ্ধে খুলনার আইচগাতির আনোয়ার ও সাতক্ষীরার আশাশুনির গলডাঙ্গা গ্রামের গাজী আনসার আলী নামে দুই মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। শত্রুদের বন্দি করে নিয়ে আসা হয় কপিলমুনি সহোচর বিদ্যামন্দির ঐতিহাসিক ময়দানে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে, এলাকার হাজার হাজার জনতার ঢল নামে ময়দানে। জনগনের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাৎক্ষণিক যুদ্ধকালীন কমান্ডাররা সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজাকারদের প্রকাশ্যে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে জনতার রায় কার্যকর করা হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা আটক করেন ১৫৫ জন রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীকে। রাজাকার ঘাঁটি থেকে উদ্ধার হয় তাদের হাতে লেখা এক হাজার ৬০১ জন শহীদের তালিকা। সেখানে দেওয়ালে পেরেকবিদ্ধ সৈয়দ আলী গাজীর ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। এ খবরে ফুঁসে ওঠে এলাকার আমজনতা। পাশের কপিলমুনি হাই স্কুলে মাঠে জনতার আদালতে গুলি করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় ১৫১ জন রাজাকারের। যুদ্ধকালীন জনতার আদালতে রায়ের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ঘটনা খুলনার পাইকগাছা কপিলমুনি ঘটনাই একমাত্র উদাহরণ। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের এই ঐতিহাসিক ঘটনার যথাযথ স্বীকৃতি মেলেনি।

কপিলমুনি মুক্ত দিবস উপলক্ষে স্থানীয় (খুলনা-৬ আসন) সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু জানান, কপিলমুনি যুদ্ধক্ষেত্রের স্মৃতি সংরক্ষণে বিগত দিনেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেওয়ালে পেরেকবিদ্ধ সৈয়দ আলী গাজীর পরিবার এবং বীরঙ্গনা গুরুদাসি মণ্ডল অবহেলিত রয়েছেন। তবে আশার কথা-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতি ও জনতার রায় কার্যকরের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স ও জাদুঘর নির্মাণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্মৃতি সংরক্ষণ কাজের উদ্বোধন করবেন।

সান নিউজ/কেটি

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ষষ্ঠী দিয়ে শুরু হলো শারদীয় দুর্গোৎসব, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশ্বশান্তির প্রার্থনায় মুখরিত প্রাঙ্গণ

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আজ শুক্রবার...

‘ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করে ছড়িয়ে দেয়া অপরাধ’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তারকাদের অবয়ব বিকৃত করে ম...

ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আজ

মরমি সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরো...

ডেঙ্গুর টিকা আমদানিতে আর্থিক সংকট হবে না : ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রকোপ বাড়তে থাকা ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত...

চবি হিসাববিজ্ঞান সমিতির রজত জয়ন্তী ২০২৭ উদযাপনে ঢাকায় প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) হিসাববিজ্ঞান সমিতির ২৫ বছরের গৌরবময় পথচলা উপলক্...

ঢাবিতে ১৬০ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে সাদা ছড়ি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ও...

আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় দাবায় ঢাবি অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন

আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় দাবা প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ...

লিটন ও মিরাজের অনুপস্থিতিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ

আবুধাবিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রিদেশীয় সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচেই মাঠে নামার আগেই বড়...

যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতে হস্তক্ষেপের আহবান মার্কিন আইনপ্রণেতার

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের চলমান ‘ক...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা