সারাদেশ

গরুর জন্য ‘আবাসিক হোটেল’

পাবনা প্রতিনিধি

দেশের অন্যতম গরু পালনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত পাবনার বেড়া উপজেলায় গড়ে উঠেছে গরুর জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী আবাসিক হোটেল। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘খাটাল’। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এখন এসব খাটাল একেবারে জমজমাট। গরুর থাকা, খাওয়ানো, বিশ্রাম থেকে শুরু করে নিরাপত্তারও ব্যবস্থা আছে সেখানে।

বেড়া পৌর এলাকার ডাকবাংলা, আমাইকোলা, শম্ভুপুর ও পৌর এলাকার বাইরে মোহনগঞ্জ, নাকালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে অন্তত ২৫টি গরুর আবাসিক হোটেল আছে। এর বেশির ভাগই হুরাসাগর ও যমুনা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। ফলে গরু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে এনে এক রাত, কখনো কখনো দুই রাত পর্যন্ত এসব খাটালে রাখেন। পরে নৌকায় করে কম খরচে সেগুলো ঢাকা, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ট্রাকের তুলনায় নৌপথে পরিবহন খরচ কম এবং এতে গরুর শারীরিক চাপও কম পড়ে।

সম্প্রতি রাতে বেড়া পৌর এলাকার ডাকবাংলা মহল্লায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে থাকা পাঁচটি গরুর আবাসিক হোটেলই গরুতে পরিপূর্ণ। কোথাও গরুকে খড় খাওয়ানো হচ্ছে, কোথাও ভুসি ও চিঁটাগুড় মিশিয়ে খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো খাটালে গরু গোসল করাতেও দেখা যায়।

হোটেলের মালিক ও গরুর ব্যাপারীরা জানান, ওই দিন সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুরে পশুর হাট ছিল। সেই হাট থেকে গরু কিনে এনে ডাকবাংলা এলাকার হোটেলগুলোতে রাখা হয়েছে।

সেখানকার আবদুল আওয়ালের খাটালে আটটি গরু এনে রেখেছেন শাহজাদপুর উপজেলার চরবর্ণিয়া গ্রামের নান্নু মিয়া। তাকে দেখা গেল গরুগুলোকে খড়-ভুসিসহ গোখাদ্য খাইয়ে ব্যাপারীদের জন্য পাতা ঢালাও বিছানায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে। নান্নু মিয়া বলেন, ‘এই খাটালগুলো আমাগেরে ম্যালা উপকারে লাগতেছে। গরুগুলো বিশ্রাম পাতেছে। আমরাও বিশ্রাম পাতেছি। দেখেশুনে নৌকা ভাড়া কইর‌্যা ঢাকার পথে গরু নিয়্যা রওনা হব।’

প্রতিটি খাটালে শুধু গরু রাখার ব্যবস্থাই নয়, গরুর ব্যাপারীদের থাকার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও তক্তা পেতে মাটি থেকে উঁচু করে বড় মাচার মতো তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ঢালাও বিছানার ব্যবস্থা আছে। গরু রাখলে ব্যবসায়ীরা বিনা খরচেই সেখানে রাত কাটাতে পারেন।

খাটালগুলোতে প্রতিদিনের জন্য গরুপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় ৫০ টাকা। অল্প সময়ের জন্য রাখলেও নির্দিষ্ট ভাড়া দিতে হয়। প্রতিটি খাটালে গরুর খাবারের জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের খাবারের পাত্র, খড়, ভুসি ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক সময় কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে এনে এখানে জড়ো করা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে একসঙ্গে নৌপথে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। এতে পরিবহন খরচ কম পড়ে এবং গরুগুলোও তুলনামূলক কম ক্লান্ত হয়।

বেড়ার নাকালিয়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী মো. আশিক বলেন, ‘হাট থেকে গরু কিনে সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিলে গরুগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই আমরা আগে খাটালে এনে বিশ্রাম দেই। এখানে গরুর খাওয়া-দাওয়া ঠিক থাকে, আবার আমাদেরও নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা হয়।’

সারা বছরই এসব খাটালে গরু রাখা হলেও কোরবানির ঈদ এলেই বাড়ে ব্যস্ততা। তখন অনেক সময় গরু রাখার জায়গাও পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই জায়গা বুকিং দিয়ে রাখেন।

শম্ভুপুর মহল্লার খাটাল মালিক আবদুল আওয়াল বলেন, ‘৩০ বছর ধইর‌্যা এই ব্যবসায় আছি। দীর্ঘ দিন ধইর‌্যা দেখতেছি ঈদের সময় খাটালে চাপ ম্যালা বাইড়্যা যায়। অনেক ব্যবসায়ী আগে থেকেই ফোন করে জায়গা ঠিক ধইর‌্যা রাখেন। একেক সময় ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি গরু চলে আসে।’

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও বেড়ায় এ ধরনের খাটালের সংখ্যা খুব কম ছিল। কিন্তু পশুর হাট ও নৌপথের সুবিধার কারণে ধীরে ধীরে এর পরিধি বেড়েছে। বর্তমানে এসব খাটালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ব্যবসাও।

গরুর আবাসিক হোটেলগুলোকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে গোখাদ্যের বেশ কিছু দোকান। এসব দোকানে ভুসি, খড়, চিটাগুড়, খৈল, এমনকি কাঁচা ঘাসও বিক্রি হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

ডাকবাংলা এলাকার ভুসি বিক্রেতা রইজ সরদার বলেন, ‘ঈদের মৌসুমে প্রতিদিন কয়েক মণ ভুসি বিক্রি হয়। খাটাল না থাকলে এত ব্যবসা হইত না।’

একই এলাকার খড় বিক্রেতা সান সরদার বলেন, ‘দূরদূরান্ত থেকে গরু এলে খড়ের চাহিদাও বাইড়্যা যায়। অনেক সময় রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা লাগে। এতে আমাগেরে আয়ও বাড়ে।’

এদিকে খাটাল মালিকদের আয় শুধু গরু রাখার ভাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। গরুর গোবর থেকেও বাড়তি আয় হয় তাদের। এসব গোবর দিয়ে জৈব সার ও ঘুঁটে তৈরি করে বিক্রি করা হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নদীতীরবর্তী হওয়ায় এসব খাটাল গরু পরিবহনের জন্য বেশ সুবিধাজনক। ব্যবসায়ীরা কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে খাটালে জড়ো করেন। পরে নৌকায় করে একসঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। এতে খরচ যেমন কমে, তেমনি দীর্ঘ পথের ধকল থেকেও গরুগুলো কিছুটা রক্ষা পায়।

খাটাল মালিকদের দাবি, গরু ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ কমানো ও গরুর নিরাপদ বিশ্রামের ব্যবস্থা করতেই এ উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব গরুর আবাসিক হোটেল এখন বেড়ার পশু ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সাননিউজ/আরএ

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মাদারীপুরের যুবক নিহত

রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ক...

জাতীয় ফুটবল দলের নতুন কোচ টমাস ডুলি

দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ খেলেছেন টমাস ডুলি। একটিতে ছিলে...

শনিবার ব্যাংক খোলা থাকবে

আগামীকাল শনিবার (২৩ মে) ব্যাংক খোলা থাকবে। সেদিন ব...

শিশুদের ওপর বর্বরতা বন্ধ করার তাগিদ ইউনিসেফের

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের প...

রাশিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারালেন কিশোরগঞ্জের যুবক

ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন কিশোরগঞ্...

গরুর জন্য ‘আবাসিক হোটেল’

দেশের অন্যতম গরু পালনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত পাবন...

অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী

দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে মন্তব্য ক...

কুষ্টিয়ায় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত ৪

কুষ্টিয়ার খোকসায় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে...

হাম ও উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৫০০ ছাড়ালো

হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল। গত ১৫...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা