দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ‘ধরার খাল’পুনঃখনন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
ঢাকায় শিশু রামিসার ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন-চার দিন আগে এই অত্যন্ত দুঃখজনক হৃদয় বিদারক একটি ঘটনা ঘটছে— এই ছোট্ট বাচ্চাকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমরা প্রথম থেকে বলে এসেছি যে, আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে, তাকে শাস্তি পেতে হবে। আইনের শাসন আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
‘আপনি যখন কোনো কাজ করেন, সেটি আপনার নিজের কাজ হোক, কৃষি কাজ হোক, সংসারের কাজ হোক…একটা নিয়ম কানুন আছে না? যেকোনো কাজ নিয়ম-কানুন মেনেই নিয়ে তো করতে হয়, তাই নয় কি?’
রামিসা হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেকোনো অন্যায়কারীকে শাস্তি দিতে হলে, তাকে তার বিচার করতে হলে সরকারের কতগুলা নিয়ম-কানুন আছে। এখন আমরা খেয়াল করেছি, আপনারাও খেয়াল করেছেন, পত্র-পত্রিকায় দেখেছেন, রেডিও টিভিতে দেখেছেন— গত কয়েকদিন ধরে কিছুসংখ্যক মানুষ একটা পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে।
‘রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিচ্ছে, যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে, এখানে আগুন ধরাচ্ছে, ওখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। এই কাজগুলো যারা করে, আপনারা কি মনে করেন প্রথমে কি আইনের শাসনকে তারা বাধাগ্রস্ত করছে না, আইনকে আইনের মত কি চলতে দিচ্ছে? দিচ্ছে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তবর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, সেই সময় আমরা দেখেছি দেশে কয়েকটি দুঃখজনক এরকম অন্যায় ঘটেছে। সেই অন্যায় যখন ঘটেছে আমি নিজে সেই সকল বাচ্চার মায়েদের সাথে কথা বলেছিলাম, আমাদের দলের আইনজীবী আমাদের দলের চিকিৎসকরা গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছে, আইনজীবীরা গিয়ে সেই আইনি সহায়তা করেছিল।
‘তখন আজকে যেই সকল ব্যক্তিরা হৈচৈ করছে, রাস্তা অবরোধ করছে, বড় বড় কথা বলছে; সেদিন কিন্তু তাদেরকে আমরা মাঠে দেখিনি, সেদিন কিন্তু আমরা দেখিনি তারা অবরোধ করেছে।’
‘তাহলে কি আমরা ধরে নেব…. আজকে যেহেতু ১২ তারিখের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ যেহেতু বিএনপিকে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করতে ক্ষমতা দিয়েছে, সেজন্যই তাদের জ্বালা হচ্ছে এবং এই জ্বালার কারণেই তারা এসব ষড়যন্ত্র করছে। তাই তো আমার মনে হয়, তাই নয় কি?’
সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করতেই এসব অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, যারা এইরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে চেষ্টা করছে, তারা কিন্তু কৃষক নিয়ে কোনো কথা বলে না। যারা একটা ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করতে চেষ্টা করছে, তারা দেশের মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে কোনো কথা বলে না।
‘যারা এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে অবরোধ করার চেষ্টা করছে, তারা কিন্তু কৃষকের খাল কাটার কথা বলে না, তারা কৃষকের কৃষক কার্ডের কথা বলে না। যারা এই ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, তারা কিন্তু ছোট ছোট গ্রামের মাসুম বাচ্চারা কীভাবে স্কুলে খালি পায়ে যায়, সেই দিকে তাদের খেয়াল নাই; তাদেরকে নতুন পোশাক দেওয়ার কথা বলে না।’
জনগণের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, আজকে যারা দেশে এইরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, তাদের ব্যাপারে আপনার তাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তারা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, এই খাল কাটা বন্ধ হয়ে যাবে সারা বাংলাদেশে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে?
‘তারা যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তাহলে আমেরিকার যে বিতরণ, সেই বিতরণ বন্ধ যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? তারা যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তাহলে কৃষকদের বিতরণ বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? তারা যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাহলে ইমাম সাহেব-মুয়াজ্জিন-খতিব সাহেবদের, অন্যান্য ধর্মীয় ধর্মের যে ধর্মগুরু আছেন, তাদের সম্মানী ভাতা হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? তারা যদি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, রাস্তাটা বন্ধ করে, তাহলে গ্রামের বাচ্চাদেরকে যে আমরা নতুন স্কুল ড্রেস দিতে চাইছি, গ্রামের বাচ্চাদেরকে যে স্কুল ব্যাগ দিতে চাইছি সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? গ্রামের বাচ্চারা হবে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে অরাজক পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামে বসবাসকারী খেটে খাওয়া মানুষ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। আপনারা পত্রপত্রিকা পড়েন, আপনারা সোশাল মিডিয়ায় যান…খবর নিয়ে দেখেন ওই যে ৫ অগাস্ট যাদেরকে এই বাংলাদেশের মানুষ এই দেশ থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছিল…এখন যারা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে; খবর নিয়ে দেখেন- ওই ৫ আগস্টে যারা বিতাড়িত হয়েছিল, তাদের সাথে তলে তলে আবার খাতির শুরু করেছে। যেইভাবে ’৯৬ সালে করেছিল, যেইভাবে ’৮৬ সালে করেছিল, তাদের সাথে নতুন কয়েকটি লেজও গজিয়েছে… সুন্দর ছোট ছোট লেজও গজিয়েছি।
‘আমরা এই দেশ থেকে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছি, বাংলাদেশের জনগণ রাজপথে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে এই দেশ থেকে। যেই স্বৈরাচার বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকারকে কেড়ে নিয়েছিল, যেই স্বৈরাচার বাংলাদেশের মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, যেই স্বৈরাচার বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষ, গ্রামে বাস করা মানুষের সকল প্রকার উন্নয়ন বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই স্বৈরাচারকে এই বাংলাদেশের মানুষ ছাত্র- জনতা রাজপথে একত্রিত হয়ে তাদেরকে এই থেকে বের করে দিয়েছে।’
এখন বাংলাদেশের মানুষ দেশ গঠন করতে চায় মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ভাগ্যের পরিবর্তন যদি করতে হয়, আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে সক্রিয় করে তুলতে হবে, আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কাজে ব্যবহার করতে হবে; তাহলেই আমরা এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারব।
‘বিএনপির পরিকল্পনা দেশ নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে; বিএনপি যে পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনার কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। একই সাথে আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরেছি কীভাবে কিছু লোক ষড়যন্ত্র করছে- এই পরিকল্পনাগুলোকে ভেস্তে দেওয়ার জন্য। যে পরিকল্পনার কথা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি, সেই পরিকল্পনাগুলো আপনারাই করেছেন- যদি এগুলো সফল হয় কারা উপকৃত হবে? আপনারা উপকৃত হবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের সময় এসেছে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য যে কাজগুলো, সেগুলো একদিকে সফল করা। আরেকদিকে যারা ন্যায় বিচারকে, সঠিক বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, যারা মানুষের জন্য গৃহীত কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্তের জন্য বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে- তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।
‘মনে রাখতে হবে এদেশের মালিক জনগণ। কিছু সংখ্যক মানুষ দেশে বিভ্রান্ত ছড়াবে, আর তারা সফল হয়ে যাবে, মানুষের ভাগ্যে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে—এই কাজ আর হতে দেওয়া যাবে না। যারা জনগণের সাথে থাকবে জনগণের পাশে থাকবে, জনগণের জন্য কাজ করবে, বাংলাদেশের জনগণ তাদেরকেই সাথে নিয়ে এই দেশকে রক্ষা করবে যেকোনো ষড়যন্ত্রের হাত থেকে।’
তিনি বলেন, আমার ঘর আমাকেই দেখতে হবে। আমাদের দেশ আমাদেরকেই দেখতে হবে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা, আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব, আমাদের দেশের মানুষের স্বার্থ আমরাই দেখব এবং যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করব আমরা ইনশাল্লাহ।
‘আসুন তাহলে আজ থেকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে যে, যারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, যারা আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বাধাগ্রস্ত করছে, যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে; তাদের বিরুদ্ধে আসলে আমরা আজকে সজাক থাকব, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সতর্ক থাকব।’
ময়মনসিংহ-৭ আসনে সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটনের সভাপতিত্বে সমাবেশে দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী খাল খননস্থলে এসে ফলক উন্মোচন করেন। এরপর খালের গিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। তিনি খালের তীরে একটি তাল গাছের চারাও রোপণ করেন।
সাননিউজ/আরএ