জাতীয়
দূষণ রোধে কাজে আসছে না কোন পরিকল্পনাই

ঢাকার চার নদীতে প্রতিদিন জমছে ৫০ হাজার টন বর্জ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা আর তুরাগ। নদীগুলো প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে ঘিরে রেখেছিল ঢাকাকে। সেই আশীর্বাদকে অভিশাপে পরিণত করা হয়েছে কেবল মানুষের ভোগ আর আগ্রাসী মানসিকতায়। চারদিকে নদী দিয়ে ঘিরে থাকা ঢাকা’ই একমাত্র ব্যতিক্রমী রাজধানী, যেমনটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ঠিক আবার প্রকৃতির এমন সুনিঁপুন আয়োজনকে তিলে তিলে হত্যা করার দৃষ্টান্তও খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও।

ঢাকার চারপাশে ঘিরে থাকা চার নদীর বুকে প্রতিদিন জমছে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত কঠিন ও তরল বর্জ্য । এর মধ্যে ৬০ শতাংশ শিল্প ও স্যুয়ারেজ বর্জ্য, ১৫ শতাংশ কঠিন বর্জ্য, ১০ শতাংশ নৌযান বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্য ১৫ শতাংশ। অন্যান্য বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, ডকইয়ার্ড ও ইটভাটার বর্জ্য, পলিথিন ইত্যাদি। এ তথ্য নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের।

ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে বেড়ে চলেছে দূষণের মাত্রা। নদীর পানি একেবারে কালো কুচকুচে। পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। শ্বাস নেয়াটাই এখন কষ্টসাধ্য। পানি এতই দূষিত যে মাছ তো দূরের কথা, বাঁচতে পারছে না জলজপ্রাণিও। ঢাকার চারপাশের চারটি নদী দূষণ রোধে কাগজে-কলমে মহাপরিকল্পনার কথা থাকলেও নেই দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি।

বুড়িগঙ্গা নদীর পানি পরীক্ষায় দেখা গেছে ক্রোমিয়াম, নাইট্রেট, সিসা ও উচ্চ মাত্রায় পারদসহ ৬৮ প্রকার অপরিশোধিত রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে। প্রতি লিটার পানিতে ক্রোমিয়াম রয়েছে দশমিক ৪৮ মিলিগ্রাম । দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম মিশ্রণ পানি পান করলেই মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। বুড়িগঙ্গা এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচে বড় বিষাক্ত পানি ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

নদীগুলোর বিশাল অংশের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি। সদরঘাটে লিটার প্রতি দ্রবীভূত অক্সিজেন পরিমাণ দশমিক ৪০ মিলিগ্রাম, ধোলাইখালে দশমিক ৩৮, পোস্তাগোলা-শ্মশানঘাটে দশমিক ৫৫, শ্যামপুরে দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম, পাগলা বাজার এলাকায় দ্রবীভূত অক্সিজেন পরিমাণ মাত্র দশমিক ৩০ মিলিগ্রাম। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায় দেখা গছে, গেলো বছর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ছিলো গড়ে শূন্য দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম। গত বছরের তুলনায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে নদী দূষণের মাত্রা।

ঢাকার চারপাশে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর চারপাশে ছোট বড় মিলে প্রায় আড়াই লাখ শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব শিল্প-কারখানার ৯৯ ভাগেরই নেই পানি শোধনাগার। এর ফলে কারখানাগুলোর তরল বর্জ্যের অধিকাংশই গিয়ে পড়ে এই চারটি নদীতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে পয়ঃবর্জ্যরে পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ঘনমিটার। এসব বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ওয়াসার সক্ষমতা রয়েছে মাত্র এক লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু ওয়াসা দৈনিক পরিশোধন করতে পারছে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার। বাকি সাড়ে ১২ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি পড়ছে নদীতে।

এরই মধ্যে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে ট্যানারি শিল্প। এতে কমেছে ট্যানারি বর্জ্যের পরিমাণ। তারপরও ট্যানারিশিল্প থেকে প্রতিদিন ২১ হাজার কিউবিক মিটার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীগুলোতে।

আবার প্রতিদিনিই বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা। গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিল্প কারখানা ও ইটভাটা। এর ফলে আরও বাড়ছে দূষণের মাত্রা। আইডব্লিউটিএ’র জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গ নদীর তলদেশে জমা হয়েছে অন্তত ৮ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর।

গত বছর ঢাকার চারপাশের নদী দূষণ রোধে ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সরকার। নদী দূষণের ৯টি কারণ চিহ্নিত করে সাজানো হয়েছে পরিকল্পনা। নদী দূষণ ও দখল রোধ এবং নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে চার ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে কিছু কর্মপরিকল্পনা রয়েছে এক বছর মেয়াদি, কিছু তিন বছর, পাঁচ বছর ও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে ১০ বছর মেয়াদি।

পরিকল্পনা চূড়ান্ত হবার পর এরই মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে ছয় মাস।

এক বছর মেয়াদি যে পরিকল্পনা ছিলো তার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে সরকার?

দৃশ্যমান অগ্রগতি বলতে গতবছর ঢাকার চারটি নদীর পাড় থেকে অধিকাংশ অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের এ অভিযান প্রসংশিত হয়েছে সব মহলে। তবে নতুন বছর উচ্ছেদ অভিযান চালানোর দৃশ্য দেখা যায়নি।

কিন্তু নদী দূষণ রোধে চোখে পড়ার মতো কোন পদক্ষেপ ছিল না। হাজার হাজার শিল্প কারখানার বর্জ্য গিয়ে মিশছে নদীতে। মিশছে স্যুয়ারেজ বর্জ্য। এসব কারাখানার বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কার্যকর কোন পদক্ষেপ। কোন ধরনের বাঁধা ছাড়াই চলছে অবৈধ কারখানাগুলো।

ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদী বাঁচাতে কাজ করছে- পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন- পবা, পরিবেশ আইনবিদ সমিতি- বেলা, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পীস ফর বাংলাদেশ, রিভারাইন পিপলসহ বেশ কিছু সংগঠন। নদিগুলো বাঁচাতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনগত লড়াইও চলছে। একের পর এক রিট হচ্ছে। আদালতের পক্ষ থেকে অনেক ধরণের নির্দেশনাও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু দূষণ রোধে কোন প্রতিকার হচ্ছে না।

সরকারি-বেসরকারি সব মহলের উদাসিনতায় ঢাকার চারপাশের নদীগুলো কি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে, না কি সরকার ১০ বছর মেয়াদি যে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে ফিরিয়ে আনবে মৃতপ্রায় নদীগুলোর হারানো রূপ ও যৌবন? এটিই এখন সময়ের প্রশ্ন।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় সৌদি

জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বিন...

শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিলের সম্মান রক্ষা

বিশ্বকাপের পর প্রথম প্রীতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল ব্রাজিল।...

সৌদি সেনাপ্রধানের সঙ্গে তুরস্ক-পাকিস্তান সেনাপ্রধানের বৈঠক

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলা...

আজীবন সম্মাননা পেলেন নূতন ও মুনমুন

টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ওটিটিসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান ও সাফ...

দোসরদের ধরতে গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের নির্দেশ

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য...

বোদায় ফুটবলের মাঠে লিজেন্ডসদের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ফুটবলের ঐতিহ্য ও সোনালী অতীতকে স্মরণ করে স্থানীয় লিজেন্...

হাম উপসর্গে আরও ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১০৬৪

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন কর...

সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে সংশোধনের সুযোগ আছে

দেশের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানো ঠেকাতে মিডিয়...

স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেও ক্ষমতার গরমের আঁচ: জামায়াত আমির

রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে ভাঙচুর ও লুটপাটের...

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে ভ্যান, চালক নিহত

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ভ্যান রাস্তার পাশের পুকুরে পড়ে স...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা