বিশেষ সংবাদ

বিশেষ সংবাদ

একটি দলের জন্ম এবং শামছুল হক
মতামত

একটি দলের জন্ম এবং শামছুল হক

মনসুর মনু

১৯৪৭ সাল, ১৪ ও ১৫ আগস্ট। প্রায় দুইশত বৎসরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শেষে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভেঙে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। পাকিস্তান আবার পূর্ব ও পশ্চিম দুই প্রদেশে বিভক্ত। মাঝখানে প্রায় ১২০০ কিলোমিটারের ব্যবধান। ১৯০৬ সালে জন্ম নেয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্বে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের জাতির জনকের মর্যাদা পেলেন। আর ১৮৬৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেসের নেতৃত্বে মহাত্মা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী পেলেন ভারতের জাতির জনকের মর্যাদা।

এরও পূর্বে ১৯৪০ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোরে মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা সম্পর্কিত ভারতের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাংশে স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ স্থাপনকল্পে ‘লাহোর প্রস্তাব’নামে একটি প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছিলেন। শেরে বাংলা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪২), আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন শেষ প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সারা ভারতে বাংলা ছাড়া আর কোথাও সরকার গঠন করতে পারেনি। অবিভক্ত বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলনে শেরেবাংলা, হোসেন সোহরাওয়ার্দী ছাড়াও মুসলিম লীগের পতাকাতলে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উদারপন্থী জনবান্ধব নেতৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। অপরদিকে খাজা নাজিমুদ্দীন, মওলানা আকরাম খাঁ, ডা. আব্দুল মোত্তালিন প্রমুখ ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বের, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। ১৯৪০-১৯৪৩ সালের শিক্ষাবর্ষ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রনেতার অবস্থানে থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমান্তরালে মুসলিম লীগের যে তরুণ নেতা সর্বজন পর্যায়ে নেতৃত্বদানে আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন - তিনি হলেন শামছুল হক। ‘লাহোর প্রস্তাব’ সম্মেলন থেকে শুরু করে প্রথম সর্ব-ভারতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচন, কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের নির্বাচন, দেশ বিভক্তি প্রশ্নে সর্ব-ভারতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচনসহ মুসলিম লীগের বিভিন্ন সম্মেলনে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি মুসলিম লীগকে ঢাকার নবাব পরিবারের কর্তৃত্ব থেকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের জন্য আবুল হাশিমের উদ্যোগে মুসলিম লীগ নেতাকর্মীদের জন্য ঢাকার ১৫০, মোগলটুলিতে একটি ‘সম্মেলন-কার্যালয়’ বা ‘পার্টি হাউজ’ স্থাপন করেছিলেন। সেইসময় ঢাকায় শামছুল হকের পাশাপাশি মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় অবদান রেখেছিলেন –কফিল উদ্দিন চৌধুরী, কমরুদ্দীন আহমদ, মহম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, শামসুজ্জোহা, বদিউজ্জামান খান, সৈয়দ নুরুল হুদা, মো. আলমাস, আব্দুল আউয়াল, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। আর অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় সক্রিয় ছিলেন খোন্দকার মোশতাক আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ। আবুল হাশিম যখন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন, সেইসময় তিনি শামসুল হককে সাথে নিয়ে সারা বাংলা ঘুরে মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা দশ লক্ষের কোঠায় উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শামছুল হক ধীরে ধীরে ঢাকার খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমিক, ছাত্রজনতাসহ সাধারণের কাছে অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। একসময় জনগণ ‘হক সাহেব’বলতে শেরেবাংলাকে বুঝতো, পরবর্তীতে সময়ের পরিবর্তনে অনেকেই ‘হক সাহেব’বলতে শামসুল হককে বুঝতে শুরু করে।

স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব অংশের প্রধানমন্ত্রী হলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। প্রাদেশিক বাংলার মুসলিম লীগের সভাপতি হলেন মওলানা আকরাম খাঁ, সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া), নুরুল আমিন প্রমুখ। উপেক্ষিত হলেন মওলানা ভাসানী, হোসেন সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শামছুল হক প্রমুখ প্রধান প্রধান নেতৃবৃন্দ। শামছুল হক ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর (১৯৪৭) ঢাকায় পূর্ব-বাংলার রাজনৈতিক যুবকর্মীদের একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। (প্রথমে এই সম্মেলনটি ২৪ আগস্ট নির্ধারিত ছিল, বিভিন্ন জেলা হতে আগত কিছু নেতাকর্মী ও প্রতিনিধিগণ ১৫০, মোগলটুলি অফিসে পৌঁছলে কমরুদ্দীন আহমদ তাদের নিয়ে একটি সভা করেন। এর আগে জুন মাসে তিনি ‘গণ আজাদী লীগ’নামে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলেন)। প্রথম দিন সোহরাওয়ার্দী-হাশিমপন্থী অধিকাংশ প্রগতিশীল মুসলিম লীগ কর্মীবৃন্দসহ বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে খান সাহেব আবুল হাসনাতের বাসায় তসদ্দুক আহমদের সভাপতিত্বে সম্মেলনটি শুরু হয়। এই সম্মেলনে শামছুল হককে সভাপতি এবং মহম্মদ তোয়াহাকে সাধারণ সম্পাদক করে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ নামে পূর্ব-পাকিস্তানে প্রথম একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাংগঠনিক কমিটিও করা হয়। পরদিন শামছুল হক সম্মেলন অনুষ্ঠানে সংগঠনটির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বক্তব্য রাখেন এবং মূল প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন। যেখানে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও ছিল। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত (১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমুদ্দুন মজলিশ’ও ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’একযোগে কর্মসূচী চালিয়ে যায়। কিন্তু ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’সরকারের রোষানলে পড়ে বেশী দিন টিকতে পারেনি। অদম্য শামছুল হক জানুয়ারী মাসে (১৯৪৮) মোগলটুলি অফিসে ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’নামে আরও একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলনে সহায়তা করেন আতাউর রহমান খান, কমরুদ্দীন আহমদ, মোশতাক আহমদ, শেখ মুজিব প্রমুখ। ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’নেতৃবৃন্দের মধ্যে আরও জড়িত ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী, আনোয়ারা খাতুন, সবুর খান প্রমুখ। ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্পে’র হয়ে শেখ মুজিব ‘তমুদ্দুন মজলিশে’র সাথে ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। শেখ মুজিব পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগেরও নেতা ছিলেন।

১৯ মার্চ ১৯৪৮ মি. জিন্নাহ ঢাকায় আগমন করেন। ২১ মার্চ বিকেলে তিনি রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল নাগরিক সম্বর্ধনায় ভাষণ প্রদানকালে বলেন –“উর্দু এন্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।” সেখানে উপস্থিত অনেক ছাত্র যুবকের মধ্যে শামসুল হক তৎক্ষণাৎ প্রথম ‘নো, নো’বলে উঠেন। তাঁর সাথে অনেকে সমস্বরে ‘নো, নো’ বলে এর প্রতিবাদ জানান। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মি. জিন্নাহ পুনরায় উর্দু ভাষার পক্ষে তার মত ব্যক্ত করলে সেখানে উপস্থিত শামছুল হকসহ সকল ছাত্রনেতা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ঐদিন সন্ধ্যায় মি. জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে বৈঠক করতে রাজী হন। শামসুল হকসহ ২১ সদস্যবিশিষ্ট সংগ্রাম পরিষদ প্রতিনিধিদের সাথে এক বাকবিতণ্ডাপূর্ণ সাক্ষাতপর্ব শেষে ২৮ মার্চ রেডিও ভাষণে মি. জিন্নাহ ভাষা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দেন।

১৯৪৯ সাল শুরু হলেও পাকিস্তান সরকার দেশের সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থ হয়। এছাড়া দুই পাকিস্তানে মোট ৩৫টি আসনের উপনির্বাচন করতে সরকারের কোন উদ্যোগও দেখা যায় না। এ অবস্থায় শামছুল হক সরকারের প্রতি পাঁচ দফা দাবিসহ এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে আন্দোলনের কথা বললে সরকার সমগ্র পাকিস্তানে মাত্র একটি আসনে উপনির্বাচনের ঘোষণা দেয়। আসনটি হল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহুকুমার দক্ষিণের মুসলিম আসন। ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে এই নির্বাচনে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রাক্তন সভাপতি মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগের খুররম খান পন্নীর সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। কিন্তু সরকার ঠুনকো এক অজুহাতে মওলানা ভাসানীকে অযোগ্য ও নির্বাচন বাতিল করে রায় দেয় এবং ২৬ এপ্রিল পুনরায় ঐ আসনে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। যেহেতু শামছুল হকের বাড়ি উক্ত নির্বাচনী এলাকায় এবং তিনি একজন উদীয়মান সর্বজনগ্রাহ্য নেতা তাই ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ নেতৃবৃন্দ সকলে তাঁকেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরূপে ঘোষণা করেন এবং সর্বাত্মক সমর্থন জানান। নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী সেই খুররম খান পন্নী, বংশ পরম্পরায় জমিদার পন্নীর সাথে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন তাদেরই প্রতিষ্ঠিত করটিয়া সা’দত কলেজের ছাত্র সংসদের প্রথম সহ-সভাপতি, যিনি পারিবারিকভাবে সহায়-সম্বলহীন একজন কৃষকের সন্তান। ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন শামছুল হকের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে জমিদার পুত্রের প্রতি প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনসহ বিভিন্ন মন্ত্রী মুসলিম লীগের পূর্ণশক্তি ও অর্থকড়ি ঢেলে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। এতদসত্ত্বেও নির্বাচনের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে জমিদারের বিরুদ্ধে শামছুল হক জয়লাভ করতে সমর্থ হন। ৮ মে তাঁকে ঢাকাবাসীর পক্ষ থেকে ভিক্টোরিয়া পার্কে এক প্রাণঢালা গণ-সম্বর্ধনা দেয়া হয়। সম্বর্ধনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় শেরেবাংলা ফজলুল হক তাঁকে পূর্ব-বাংলার ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী রূপে আশা প্রকাশ ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন। কিন্তু সরকার নির্বাচনী প্রচার সংক্রান্ত সামান্য ত্রুটির এক কারসাজি মামলায় ফেলে শামছুল হককে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আসনে বসার সুযোগ দেয়নি। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিজয় বাতিল ঘোষিত হয়।

দেশ বিভাগের পর নানা বৈষম্য, স্বাস্থ্য-শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা অনিয়ম, খাদ্য সংকট এসব বিভিন্ন বিষয়সহ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা এবং ব্যক্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অপূর্ণতা নিয়ে শামছুল হক নতুন একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। এ ব্যাপারে তিনি শেরেবাংলা, হোসেন সোহরাওয়ার্দী ও বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মতামত জানতে তাদের শরণাপন্ন হন। তাদের কেউই শামছুল হকের প্রস্তাবিত সরকার বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান পদ গ্রহণে রাজী হলেন না। অবশেষে শামছুল হক একদিন তাঁর পরিকল্পিত দলের ম্যানিফেস্টো ও সাংগঠনিক রূপকল্প তৈরী করে মওলানা ভাসানীকে সভাপতির প্রস্তাব দিয়ে আসামে খবর পাঠালেন। ভাসানী এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং ঢাকায় চলে আসলেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ কর্মীদের অংশগ্রহণ করার জন্য মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে আলী আমজাদ খান ও ইয়ার মোহাম্মদ খানের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির পক্ষে এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের আহবান করা হয়। তদানুসারে কাজী বশির হুমায়ুনের আমন্ত্রণে তার স্বামীবাগস্থ রোজগার্ডেন বাসভবনে প্রথমদিন বিকেলে প্রায় তিনশত কর্মী নিয়ে সম্মেলনটি শুরু হয়। চলে রাত্রি পর্যন্ত। সম্মেলন অধিবেশনে উপস্থিত অতিথিবৃন্দরা হলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক, আতাউর রহমান খান, আব্দুল জব্বর খদ্দর, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আলী আহম্মদ খান, শামসুদ্দীন আহমদ, শওকত আলী, আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, মওলানা আরিফ চৌধুরী, মওলানা শামসুল হক প্রমুখ। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ ছাত্র-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। শেরেবাংলা শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। এরপর শামছুল হক তাঁর বক্তব্য প্রদান শেষে ‘মূলদাবি’নামে একটি পুস্তিকা উপস্থিত কর্মীদের পাঠ-বিবেচনার জন্য দেন। যেখানে শামছুল হক সম্মেলনের উদ্দেশ্য, দেশের নানা সমস্যার বিবরণ, ভবিষ্যৎ কর্মসূচী প্রণয়ন বিষয়সহ পূর্ব-পাকিস্তানকে সুখী-সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রে গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করে কিছু প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছেন। সুদীর্ঘ আলোচনার পর প্রথমদিনের অধিবেশনে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম লীগের পরিবর্তিত রূপায়নে একে একটি গণ-প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন রাজনৈতিক দলে পুনর্গঠন করার প্রস্তাব গৃহীত হয় –যার নাম ‘পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। অধিবেশন শেষে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, শামছুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং খোন্দকার মোশতাক ও শেখ মুজিবকে যুগ্ম-সম্পাদক করে ৪০ সদস্যের একটি সাংগঠনিক কমিটি প্রস্তাবিত হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। কারাগারে আটক শেখ মুজিবকে শামছুল হকের সুপারিশে ছাত্রলীগের দায়িত্ব ত্যাগের পরিবর্তে কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক পদে নির্বাচন করা হয়। সম্মেলনে শামছুল হকের লিখিত ‘মূলদাবি’সামান্য পরিবর্তন করে ‘পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে’র খসড়া ম্যানিফেস্টোরূপে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। পরদিন বিকেলে আরমানিটোলা ময়দানে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে প্রায় চার হাজার লোকের উপস্থিতিতে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে সদরঘাট মুকুল সিনেমা হলে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগে’র প্রথম কাউন্সিল অধিবেশন বসে। ততদিনে শামছুল হক রাজনৈতিকভাবে, বিবাহিত জীবনে আর সক্রিয় পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে দীর্ঘ কারাবাসে পরাজিত, অতৃপ্ত ও মানসিক অবসাদগ্রস্থ ভাগ্যাহত পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন জীবনের অধিকারী হয়েছেন। কাউন্সিল অধিবেশনে উপস্থিত হয়েও অবহেলিত, অপমানিত। অধিবেশন শেষে মওলানা ভাসানী হলেন সভাপতি আর শেখ মুজিবুর রহমান হলেন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে এক কাউন্সিল অনুষ্ঠানে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’দলের নাম হতে ‘মুসলিম’শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু ‘আওয়ামী লীগ’নাম ধারণ করে শামছুল হকের গড়া দলটি।

শামছুল হকের মনোজগতে সৃষ্ট হওয়া এক বিশাল ঘূর্ণাবাত পৃথিবীর বস্তুজগতের জীবন প্রবাহ থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি হন পথহারা পথিক। বেশভূষাহীন মুসাফির। বিভিন্নভাবে তাঁকে মানসিক চিকিৎসাও দেয়া হয়-তা সত্ত্বেও তিনি একসময় পরিচিত মানুষজন, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরবর্তীতে জানা যায়, ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যমুনা নদীর তীরবর্তী সিরাজগঞ্জ এলাকায় জনৈক নেতা মহির উদ্দিনের বাসায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। শামছুল হক ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারী টাঙ্গাইল এলাসিনের শাকইজোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে ইডেন কলেজের শিক্ষিকা আফিয়া খাতুনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর দুই মেয়ে আমেরিকা প্রবাসী। ‘বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম’তাঁর লেখা একটি বিখ্যাত বই।

লেখক: ম্যানেজার, শেয়ার বিভাগ
ফার ইস্ট নিটিং এন্ড ডাইং ইন্ড্রাস্টিজ লিমিটেড

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

টিকা নেয়ার পর করোনা আক্রান্ত হলেন সচিব

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাণঘাতী কর...

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের এক যুগ আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৫ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম...

নিখোঁজের দু'দিন পর গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা : চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে নিখোঁজের...

দলীয় প্রতীকেই ইউপি নির্বাচন

মোহাম্মদ রুবেল : দলীয় প্রতীকেই থা...

সেতুর নিরাপত্তা বেষ্টনী কেটে গড়ে ওঠেছে হোটেল 

মো. নাজির হোসেন, মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী...

বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের চূ...

দুইদিন পর ‘বন্দিদশা’ থেকে মুক্তি টাইগারদের

ক্রীড়া ডেস্ক : সফরে খেলা শুধু তিন...

ভ্রমণে যেতে তিনটি জিনিস অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন

সান নিউজ ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতি...

আজ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক : বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্ম...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা