বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই এই বাজারে যায়। তবে চলতি বছরের শুরু থেকেই এই বাজারে রফতানিতে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।
ইউরোস্ট্যাটের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন মোট ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম। শুধু মে মাসেই রফতানির পরিমাণ কমেছে ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ।
অর্ডার কমে যাওয়ায় বাড়ছে চাপ
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বিরাজমান অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের রফতানিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা আগে দেওয়া অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা কিছু ক্ষেত্রে তা স্থগিত করেছেন। ফলে উৎপাদন ও রফতানি—উভয় ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদের ভাষ্য, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংঘাতের প্রভাব ইউরোপীয় বাজারেও পড়েছে। এর ফলে অনেক ক্রেতা তাদের ক্রয় পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে।
দাম কমিয়েও সুবিধা মিলছে না
রফতানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি কমেছে পণ্যের গড় রফতানি মূল্যও। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম দামে ইউরোপীয় বাজারে পোশাক বিক্রি করেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রফতানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৭৭ ইউরো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম দামে পণ্য বিক্রি করেও রফতানি বাড়ানো সম্ভব হয়নি, যা শিল্পের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হারানো অর্ডার ফিরে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতে হারানো অর্ডারগুলো পুনরুদ্ধার করাও বড় চ্যালেঞ্জ। যেসব ক্রয়াদেশ কমেছে বা অন্য দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে, সেগুলো আবার বাংলাদেশে ফিরবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তাদের মতে, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান
বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের রফতানিও কমেছে। প্রথম পাঁচ মাসে দেশটির তৈরি পোশাক রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে, তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে চীন ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ সময়ে দেশটির রফতানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
ভিয়েতনামও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রি করেও দেশটি বাজারে শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। একই সময়ে তাদের রফতানি কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ।
সামনের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে টানা রফতানি হ্রাস, মূল্য কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার সংকোচনের কারণে খাতটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর নীতি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং উৎপাদন সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।