দারিদ্র্য কমেছে, নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে, অবকাঠামোতে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। তবু জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, আয় বৈষম্য ও সুশাসনের মতো চ্যালেঞ্জ এখনো বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথকে কঠিন করে তুলছে। ২০৩০ সালের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান কোথায়?
আর মাত্র কয়েক বছর, তারপর?
২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়েছিল সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (SDGs), সতেরোটি লক্ষ্য, ১৬৯টি টার্গেট, সময়সীমা ২০৩০ সাল। লক্ষ্য ছিল এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে দারিদ্র্য হবে অতীত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হবে সবার অধিকার, আর উন্নয়ন হবে পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
বাংলাদেশ শুরু থেকেই এই উদ্যোগের সক্রিয় অংশীদার এবং জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজিকে সমন্বয় করে চলেছে। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, ততই জোরালো হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি সত্যিই ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে?
সংখ্যার ভাষায় বাংলাদেশের অবস্থান
জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থা SDSN-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১১৪তম, স্কোর প্রায় ৬৩ দশমিক ৯। কয়েক বছর আগেও চিত্রটা ভালো ছিল। ২০২৩ সালে ছিল ১০১তম, ২০২৪ সালে ১০৭তম, আর সবশেষ মূল্যায়নে র্যাংকিং আরও পিছিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল এখন এগিয়ে আছে; ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও সেই ব্যবধান দ্রুত কমছে।
সতেরোটি লক্ষ্যের মধ্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি অর্জন করতে পেরেছে কেবল একটি, জলবায়ু কার্যক্রম। শিক্ষার মান নিয়ে অগ্রগতি মোটামুটি সঠিক পথে থাকলেও দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে মাঝারি গতিতে। জেন্ডার সমতা, শোভন কর্মসংস্থান, বৈষম্য হ্রাস ও টেকসই নগরায়ণে অবস্থান কার্যত স্থবির, আর নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার লক্ষ্য দুটিতে অগ্রগতি বরং পিছিয়েছে। বৈশ্বিকভাবেও অবশ্য একই ছবি। কোনো দেশই বর্তমান গতিতে সতেরোটি লক্ষ্যের সবগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করতে পারবে না, ফলে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ একক কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং এক বৈশ্বিক বাস্তবতারই অংশ।
দারিদ্র্য হ্রাস: সবচেয়ে বড় সাফল্য
একসময় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হলেও গত তিন দশকে সেই চিত্র বদলে গেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তার, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মিলিয়ে কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি স্বীকৃত উদাহরণে পরিণত করেছে। তবে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দারিদ্র্যের হার সংখ্যায় কমলেও বাস্তব অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: অগ্রগতির পাশে নতুন চ্যালেঞ্জ
প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হার এখন প্রায় সর্বজনীন এবং ছেলে-মেয়ের ব্যবধানও কমেছে, কিন্তু শুধু ভর্তি বাড়লেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে সনদের চেয়ে দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, আর সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এখন জরুরি। স্বাস্থ্য খাতেও একই রকম দ্বৈততা দেখা যায়। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান সফল হয়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট, শহর-গ্রাম বৈষম্য এবং ডায়াবেটিস-হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগের দ্রুত বিস্তার ভবিষ্যতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু
পোশাক শিল্প, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও সেবাখাতে নারীর অংশগ্রহণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দিয়েছে, তবে সমান মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নেতৃত্বে প্রতিনিধিত্ব এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জেন্ডার সমতা তাই এখনো একটি চলমান প্রক্রিয়া। অন্যদিকে জলবায়ু কার্যক্রম কাগজে-কলমে বাংলাদেশের একমাত্র পুরোপুরি অর্জিত লক্ষ্য হলেও বাস্তবতা জটিল। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন লাখো মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে ফেলছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
এলডিসি উত্তরণ ও সামনের পথ
এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি ঐতিহাসিক অর্জন হলেও শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় উৎপাদনশীলতা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দিতে হবে, নইলে এই গর্বের অর্জনই নতুন সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে তাই শুধু গতি ধরে রাখলেই হবে না, উন্নয়নের মানও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানমুখী শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সুশাসন শক্তিশালীকরণ, এই সবগুলো ফ্রন্টে একযোগে এগোনোর ওপরেই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
শেষ কথা
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক, কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি সতর্কবার্তাও দেয়। অগ্রগতির গতি থেমে গেলে অর্জিত সাফল্যও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এসডিজি আসলে কেবল কয়েকটি সূচকে ভালো ফল করার নাম নয়; এটি এমন এক দর্শন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সমান গুরুত্ব পায় সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আগামী কয়েক বছরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ শুধু একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে থাকবে, নাকি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বৈশ্বিক উদাহরণ হয়ে উঠবে।
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (NSTU)