বৃষ্টি আর পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাতে রাজধানীর বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মাংস, মাছ, সবজি থেকে শুরু করে ডিম, চাল, ডাল ও ভোজ্যতেল— প্রায় সব পণ্যের বাজারেই চাপ বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগি, পাঙাশ মাছ ও গরুর মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।
সর্বোপরি পরিবহন খরচ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। ব্যবসায়ীরা বৃষ্টি ও তেলের দাম বাড়ার কথা বললেও ভোক্তাদের অভিযোগ— কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও চাপে পড়েছে, আর বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
শুক্রবার (১ মে) রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকতে দেখা গেছে।
সবজির মধ্যে গত এক সপ্তাহে আরও বেড়েছে পেঁয়াজ, শসা, বেগুন, মরিচ, পেঁপের দাম। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তি। মুদি পণ্যের মধ্যে চিনি, মোটা মসুর, পোলাও চালের দাম বেড়েছে। আর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলেও বাজারে এখনো পণ্যটির সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন বৃষ্টির কারণে সবজির স্বাভাবিক সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সব মিলিয়ে সবজির দামে তার প্রভাব পড়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে বাজারে অন্তত নয়টি সবজির দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে শসার। কেজিতে ৩০ টাকা থেকে দাম বেড়ে আজ হাইব্রিড শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। দেশি জাতের শসার দাম আরও কিছুটা বেশি। এ ছাড়া বেগুন, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, টমেটোর দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। কাঁচা পেঁপের ও মরিচের দাম ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত মাসের তুলনায় বাজারে শসার দাম ১১১ শতাংশ, কাঁচা পেঁপের দাম ৮৭ শতাংশ, দেশি টমেটোর দাম ২৫ শতাংশ ও বেগুনের দাম সাত শতাংশ বেড়েছে।
গত এক সপ্তাহে পেঁয়াজের দামও কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে। তাতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। অবশ্য চলতি বছর দীর্ঘ সময় খুবই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। এতে কৃষকেরা তেমন লাভ করতে পারেননি। এখন দাম কিছুটা বাড়ায় তাদের মুনাফা বাড়তে পারে।
বাজারে প্রতি কেজি আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা, টমেটো ৬০, করলা ৬০ থেকে ৬৫, পটল ৬০, লাউ প্রতি পিস ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁপে ৭০, গাজর ৮০, ঢেঁড়স ৬০, চিচিঙ্গা ও ঝিঙে ৭০, শসা ১০০-১১০, বরবটি ৮০, কাঁকরোল ১২০, বেগুন প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা ও ধুন্দুল ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা আমিনুল হক বলেন, দুই দিন ধরে বাজারে সবজির গাড়ি কম আসছে। ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় সবজি খেতে পানি জমেছে। কৃষকেরা সবজি তুলতে পারছেন না। এ কারণে কিছু সবজির দাম বেড়েছে। তবে মাস শেষ হয়ে আসায় বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও কম বলে জানান তিনি।
এদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশেও ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। তাতে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা ও পেট্রলে ১৯ টাকা দাম বেড়েছে। এর প্রভাবও পণ্যের দামে পড়েছে।
মগবাজারের সবজি বিক্রেতা হামিদ বলেন, গত কয়দিন ধরে দেশের সব জায়গায় বৃষ্টি। অনেক জায়গায় বৃষ্টির কারণে সবজি খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। যার জন্য আগে যে পরিমাণ সবজি ঢাকায় আসত তার তুলনায় কম আসছে। আর তেলের দাম বাড়ছে। ভাড়া বেশি দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকা থেকে সবজি পরিবহনে ট্রাকভাড়া পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা বেড়েছে। আর গত তিন দিনে বৃষ্টির কারণে পণ্যের সরবরাহ কম ছিল। এ দুই কারণে বাজারে সবজির দাম বাড়তি।
আজ বাজারে ফার্মের মুরগির এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দরে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এ দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে। এর আগে ডিমের ডজন ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। ডিমের দাম বাড়ার পেছনেও পরিবহনভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া ডিমের কিছুটা সরবরাহসংকটও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ।
বাজারে ব্রয়লার মুরগির দামও চড়া। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। মাস দেড়েক আগে ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সোনালি মুরগির দাম অবশ্য কিছুটা কমেছে। আজ রাজধানীর তিনটি বাজারে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর কালারবার্ড বা হাইব্রিড সোনালি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে আরও ৩০ টাকা বেশি ছিল। আর রোজার ঈদের পর ৪০০ টাকার ওপরে সোনালি বিক্রি হয়েছিল।
এদিন বিভিন্ন বাজারে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৮০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ বিক্রেতা ৮০০ টাকার নিচে বিক্রি করছেন না।
মুগদা ছোট বাজারের মাংস বিতানের মোহাম্মদ হানিফ জানান, তেলের দাম বাড়ছে। ভাড়া আগের চেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে। গরুর মাংসের দাম আর কমবে না। সামনে কোরবানির ঈদ। এখন থেকে ব্যাপারীরা কোরবানি ধরেই গরুর দাম ঠিক করছে।
মুরগির দোকানে ব্রয়লারের দাম শুনে খিলগাঁও বাজারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন খাদিজা নামের এক ক্রেতা। তিনি বলেন, কয়দিন আগে ১৮০ টাকা করে কিনছি। এখন কয় ২০০ টাকা। সবকিছুর দাম বাড়লে গরিব বাঁচবে কেমনে? শোনেন না, মাইকে শ্রমিকদের কথা কয়। কিন্তু শ্রমিকরা যে কেমনে চলে কেউ কইতে পারবে না।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। সব ধরনের মাছ সপ্তাহ ব্যবধানে ১০-২০ টাকা বেড়ে গেছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গরিবের মাছ খ্যাত পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৬০ টাকায়। হাফ কেজি ওজনের ইলিশের কেজি এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৩০, পাবদা ৩৮০, রুই ৩২০ থেকে ৩৬০, কাতল ৪০০, টেংরা ৮৫০, গলদা চিংড়ি ছোট ও বড় যথাক্রমে এক হাজার থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মোড়কজাত পোলাও চালের দাম কেজিতে আরও ১৫ টাকা বেড়েছে। তাতে এক কেজি পোলাও চালের প্যাকেটের নতুন দাম হয়েছে ১৯০ টাকা। অবশ্য বিক্রেতারা এটি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি করেন। আর আগের আনা থাকলে দাম রাখা হয় ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। খোলা পোলাও চালের দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।
বাজারে দুই সপ্তাহ আগে খোলা চিনির দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ১০৫ থেকে ১১০ টাকা হয়েছিল। আজ এ দামে চিনি বিক্রি হচ্ছে। আর মোটা দানার মসুর ডালের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা হয়েছে।
বুধবার দেশে বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়ানো হয়। বোতলজাত এক লিটার সয়াবিনের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়েছে। তাতে পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম হয়েছে সর্বোচ্চ ৯৭৫ টাকা।
বাজারে প্রায় তিন মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসংকট রয়েছে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে জানিয়ে দেশেও দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল কোম্পানিগুলো। পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহও কম ছিল। তবে এত দিন সায় না দিলেও বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম বাড়ানোর অনুমতি দেয়।
অবশ্য মূল্যবৃদ্ধির এক দিন পর বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসংকট রয়েছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুদিবিক্রেতা হুমায়ূন কবির বলেন, দাম বাড়ানোয় দুই-তিন দিনের মধ্যে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ বাড়তে পারে। তিনটি ভোজ্যতেল কোম্পানির ডিলাররা আমাদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
ধান থেকে চাল উৎপাদন, খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন-প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচও বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বেড়েছে চালের বাজারে। বর্তমানে মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মিনিকেট চাল প্রায় ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় বেশি।
যাত্রাবাড়ী আড়তের চাল ব্যবসায়ী সাহেদ আলী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও কেজিতে দুই-তিন টাকার বেশি বাড়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে পাঁচ-ছয় টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। তার মতে, পাইকারি পর্যায়ের এই বাড়তি দামই খুচরা বাজারে আরও বেশি চাপ তৈরি করছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় আবারও প্রমাণ হয়েছে-সরকার কার্যত ব্যবসায়ীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে।
তিনি বলেন, সকালে বনস্পতি ব্যবসায়ী সমিতি দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, আর বিকালেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে।
নাজের হোসাইন আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কথা বললেও বর্তমানে বাজারে থাকা ভোজ্যতেলের বেশিরভাগই তিন থেকে ছয় মাস আগে আমদানি করা। ফলে এই অজুহাতে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। বরং আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে।
নাজের হোসাইনের মতে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে সাধারণ ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলো কারা, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় দাম বাড়াচ্ছে-এসব সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সমস্যার লাগাম দৃশ্যমান, প্রয়োজন শুধু সেটি টেনে ধরা। কিন্তু অজানা কারণে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
সাননিউজ/আরএ