মাদারীপুরে অবৈধ ড্রেজারে গিলছে আড়িয়াল খাঁ নদী। নদী ভাঙনের শিকার ঘর,জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নদী ভাঙন রোধে শত পরিবারের আর্তনাদ।
একসময় ছিল বসতভিটা, ছিল ফসলে ভরা জমি, ছিল স্বচ্ছল সংসার। আজ সেই সবকিছুই স্মৃতি। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াল ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে আশ্রিত মো. এনামুল আকন। তাঁর মতো আরও শতাধিক পরিবার প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা এনামুল আকন (৪৮)। একসময় পরিবারের সঙ্গে প্রায় ১০ বিঘা আবাদি জমিতে কৃষিকাজ করতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ধীরে ধীরে নদী গিলে খেতে শুরু করে তাদের জমি। পরে পারিবারিক ভাগে পাওয়া শেষ দুই বিঘা জমি ও বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখন পরিবার নিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় সাইফুল ইসলামের আট শতাংশ জমিতে।
চোখে জল নিয়ে এনামুল বলেন, “যদি ড্রেজার দিয়ে বালু না তোলা হতো, তাহলে এভাবে নদী ভাঙত না। যারা এসব করছে তারা খুবই প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে রাতে হামলার ভয় থাকে। তাই মুখ খুলতেও ভয় পাই। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই।”
একই গ্রামের টিটল আকনের জীবনেও নেমে এসেছে একই ট্র্যাজেডি। গোলাভরা ধান, বসতবাড়ি আর ফসলি জমি—সবই এখন নদীর তলদেশে। পরিবার নিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে নদীর ওপারে নিজের সামান্য ছয় শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের এলাকায় আগে কখনো নদীভাঙন ছিল না। ড্রেজার বসানোর পর থেকেই ভাঙন শুরু হয়েছে। যারা বালু তোলে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস কারও নেই।”
ভাঙনের মানচিত্রে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম
আড়িয়াল খাঁ নদী মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়ন এবং কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন নদীভাঙনের স্থায়ী ঝুঁকিতে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাটবাজার। যাদের ঘর এখনো নদীর কিনারায় টিকে আছে, তারা প্রতিটি বর্ষায় নতুন আতঙ্কে দিন কাটান কখন যে নদী তাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয়।
অনেকেই জানান, নাম প্রকাশ করতেও ভয় পান তারা। কারণ, প্রতিবাদ করলে হামলা কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। একজন বৃদ্ধের কণ্ঠে ছিল দীর্ঘশ্বাস, “সংবাদ করলে আমাদেরই বিপদ হয়। কিন্তু সমাধান আর হয় না।”
শিক্ষা ও জনজীবনেও বিপর্যয়
নদীভাঙনের ধাক্কা শুধু বসতবাড়িতেই থেমে নেই। চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সামাজিক স্থাপনা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় শিক্ষার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে স্কুলের শিক্ষার্থী আরিফ সরদার জানান, যেভাবে নদী ভাঙতেছে আমাদের নৌকায় উঠতে অনেক অনেক ভয় করে এ কারণে মাঝে মাঝে স্কুলে যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী বলেন, “রাতভর ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। কিছু বলতে গেলে উল্টো ভয় দেখানো হয়।”
শাহানুর আকন, সিদ্দিকী আকন, আজম হাওলাদার, রাজ্জাক হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজারে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে সাতবার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে। তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে এই জনপদ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
মাদ্রা বাজারের বাসিন্দা বিল্লাল হোসাইন অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
বিষয়ে ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদারের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার বলেন, আমি নদীর পাড়ে একটি বরই বাগান ও আমের বাগান করেছিলাম কয়েক জনে মিলে। শামীম আকন নদীর পাড়ে মাটি ড্রেজার আলাদের কাছে বিক্রি করায় আমার সেই বাগান নদীর ভাঙ্গনে নদীর গর্ভ চলে গেছে। আমি ওরে বাধা দিলেও ও আমাকে লোক দিয়ে মারতে আসে। প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাই।
হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, “তারা অনেক প্রভাবশালী। আমি প্রতিবাদ করলে আমার ওপরও হামলার আশঙ্কা আছে।”
কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহিদ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তাঁকে অবহিত করেননি বলে দাবি করেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান জানান, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক মিজ্ মর্জিনা আক্তার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট টিম নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা চলমান থাকবে।
আড়িয়াল খাঁর তীরে দাঁড়িয়ে এখন মানুষের একটাই প্রশ্ন অবৈধ ড্রেজারের গর্জন থামবে কবে? তার আগেই কি নদী গিলে খাবে এই জনপদের শেষ আশ্রয়টুকুও?
সান নিউজ/ জামান