মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের চারটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এ ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধ বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে হামলার দাবি
রোববার (১২ জুলাই) প্রকাশিত পৃথক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হামলায় ঘাঁটির যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
কুয়েত ও বাহরাইনেও ড্রোন হামলার অভিযোগ
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোনের মাধ্যমে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার এবং একটি রাডার স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
একই সঙ্গে বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও একটি রাডার স্থাপনায়ও ড্রোন হামলা হয়েছে বলে দাবি তেহরানের। ইরানের ভাষ্য, দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
জর্ডানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি
আইআরজিসি আরও জানায়, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তাদের দাবি, হামলায় ঘাঁটির কমান্ড সেন্টার এবং এমকিউ-৯ ড্রোন সংরক্ষণের হ্যাঙ্গার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালির ঘটনাকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত একটি জাহাজে হামলার ঘটনার পর ইরানের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা চালানোর কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
আইআরজিসির দাবি, ওই জাহাজটি নির্ধারিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে অনুমোদিত নৌপথ ছেড়ে চলাচল করছিল এবং একাধিক সতর্কবার্তা অমান্য করেছিল। এ কারণেই জাহাজটিকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয় বলে দাবি তাদের।
সেন্টকমের পাল্টা বক্তব্য
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আইআরজিসির হামলার পরই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে একাধিক তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ গুরুতরভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, পূর্ববর্তী হামলার পরও ইরানকে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কঠোর বার্তা
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেন্টকমের বিবৃতি শেয়ার করে বলেন, ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এর পরিণতি তাদের বহন করতে হবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর থেকেই ইরানকে ঘিরে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও।
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা ও চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ওমানসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরার সম্ভাবনা আপাতত আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।