দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও রপ্তানি আয় সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বৈদেশিক পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (বিওপি)-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
কেন বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি?
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, শিল্প কাঁচামাল এবং অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারের চ্যালেঞ্জ, চাহিদার পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতার কারণে রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়েছে।
আমদানিতে ঊর্ধ্বগতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশ ৬৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৬০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা, জ্বালানি আমদানি এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্য আমদানির ব্যয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী প্রবণতা
একই সময়ে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৪০ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ২ শতাংশ কম।
রপ্তানি আয়ের এই পতন এবং আমদানির উচ্চ প্রবৃদ্ধিই মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি হিসাব এখনও ঋণাত্মক
চলতি হিসাবের ভারসাম্য (Current Account Balance) একটি দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে, আর ঘাটতি থাকলে তা পূরণে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ৩০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৭৮ কোটি ডলার।
সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে ইতিবাচক অবস্থান
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে হলেও সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন বা ওভারঅল ব্যালেন্সে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে।
প্রথম ১১ মাসে এই সূচকে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪০২ কোটি ডলার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই সূচক ছিল ১১৫ কোটি ডলার ঘাটতিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণে সামগ্রিক লেনদেনে এই উন্নতি এসেছে।
রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধি
অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩ হাজার ২৭৭ কোটি ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। ফলে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কমেছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রবাহেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে এফডিআই এসেছে ১৩১ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৫৫ কোটি ডলার।
শেয়ারবাজার থেকেও বিদেশি মূলধন বেরিয়ে যাচ্ছে
শুধু প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ নয়, পোর্টফোলিও বিনিয়োগেও নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার তুলে নিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই নেতিবাচক অবস্থান ছিল ১৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং উচ্চমূল্যের আমদানিনির্ভরতা কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ অর্থনীতিতে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।