ফিচার

জলাবদ্ধতার শঙ্কায় ঢাকা

সান নিউজ ডেস্ক

গত ১৬ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং ওয়াসা থেকে দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে নালা ও খাল হস্তান্তর করেও কাটেনি ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট। বর্ষা শুরুর আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানালেও, একদিকে অকেজো পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট, অন্যদিকে অবৈধ দখল ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরাট হওয়া খালের কারণে এবারের আষাঢ়-শ্রাবণেও রাজধানীতে তীব্র জলজটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নগর পরিকল্পনাবিদরা জানিয়েছেন, মূলত পাঁচ স্তরের সংকট একসঙ্গে জেঁকে বসেছে ঢাকার বুকে। প্রথমত, সড়কের ক্যাচপিটের ছিদ্রগুলো আবর্জনায় বন্ধ; দ্বিতীয়ত, ড্রেনগুলো পলি ও কাদায় ভরা; তৃতীয়ত, অবৈধ দখলে হারিয়ে গেছে প্রধান খালগুলো; চতুর্থত, পাম্পিং স্টেশনগুলো অকেজো আর পঞ্চমত, চারপাশের নদনদীগুলো ভরাট হয়ে হারিয়েছে পানি ধারণের সক্ষমতা। ফলে বৃষ্টির পানি ক্যাচপিট থেকে ড্রেনে, ড্রেন থেকে খালে এবং খাল হয়ে নদীতে যাওয়ার প্রতিটি ধাপেই অচল হয়ে পড়ে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়, দফায় দফায় সভা আর প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গেলেও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। সমস্যার গভীরে হাত না দিয়ে বারবার উপরিভাগে প্রলেপ দেওয়ার কারণেই প্রতি বর্ষায় ঢাকা ফিরে যায় তার সেই চেনা ও চরম ভোগান্তির রূপে।


সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের পর রাজধানীর নিউমার্কেট, আজিমপুর, নীলক্ষেত, বকশিবাজার, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, আরামবাগ, মতিঝিল, বনানী, খিলক্ষেত, উত্তরার কিছু অংশ, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, মিরপুর ১৩, হাতিরঝিলের কিছু অংশ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট যাওয়ার নতুন রাস্তা, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট-তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা, মোহাম্মদপুরের কিছু অংশ, মেরুল বাড্ডা ও ডিআইটি প্রজেক্টসহ বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে নিয়মিত জলাবদ্ধতা তৈরি হতে দেখা গেছে।
জলাবদ্ধতার এই স্পটগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনও নিতে পারেনি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। ফলে এবারের বর্ষাতেও ঢাকা শহর তীব্র জলজটের কবলে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ জলাবদ্ধতা নিরসনে অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে সম্প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এই তালিকায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কমলাপুর রেলস্টেশন, শাপলা চত্বর, নটর ডেম কলেজ এলাকা, পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নায়েম রোড, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশী এস এম হলের সামনে, সাকুরা মার্কেট এলাকা, মোকাররম ভবনের সামনে, চানমারির মোড়, শান্তিবাগ, আলমবাগ, পশ্চিম জুরাইন এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সড়ক।


ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি ঢাকার ড্রেন, নালা আর খালে গিয়ে পড়ছে এবং সেখানে আটকে থেকে পানি নিষ্কাশনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ওপর কিছু খাল এখনও অবৈধ দখলে রয়েছে, আর বাকি খালগুলো যেভাবে সংকুচিত করা হয়েছে, তা দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্র জানিয়েছে, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএসসিসি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের আওতায় নর্দমা, বক্স-কালভার্ট ও খাল থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণ, ভারী বর্ষণের সময় পোর্টেবল পাম্পের সাহায্যে দ্রুত পানি সরিয়ে নেওয়া, বিদ্যমান পাম্প স্টেশনগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক জরুরি প্রতিক্রিয়া (ইমার্জেন্সি রেসপন্স) দল গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ সিটির ৫৭টি ওয়ার্ডে একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রয়েছে খাল পুনরুদ্ধার ও সংস্কার, নতুন আউটলেট নির্মাণ, ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং পাম্প স্টেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে জিয়া সরণি খাল ও শ্যামপুর খালের পানি সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য নতুন আউটলেট নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান নর্দমা সংস্কার, ব্লকেজ অপসারণ, খোলা ও সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, জলাভূমি সংরক্ষণ, খাল ও ড্রেনে বর্জ্য ফেলা বন্ধে জনসচেতনতা তৈরি এবং সেপটিক ট্যাংক নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজধানীর পানি মূলত পাম্প স্টেশন, স্লুইসগেট ও খালের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বেশ কয়েকটি পাম্প স্টেশন নষ্ট এবং একইভাবে স্লুইসগেটগুলোও অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে খালগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক; এগুলো পানি প্রবাহের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। অবৈধ দখলের পাশাপাশি নানা ধরনের বর্জ্য জমে খালগুলোতে তৈরি হয়েছে কয়েক স্তরের প্রতিবন্ধকতা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি ঢাকার ড্রেন, নালা আর খালে গিয়ে পড়ছে এবং সেখানে আটকে থেকে পানি নিষ্কাশনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ওপর কিছু খাল এখনও অবৈধ দখলে রয়েছে, আর বাকি খালগুলো যেভাবে সংকুচিত করা হয়েছে, তা দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা।
এদিকে পাম্পিং স্টেশনের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বড় জটিলতা রয়েছে পানি নিষ্কাশনের শেষ স্তর অর্থাৎ ঢাকার চারপাশের নদনদীগুলোতে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী নানা কারণে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় এগুলো আর বেশি পানি ধারণ করতে পারছে না। নদীগুলোর নাব্যতা সংকটের কারণে বিগত বছরগুলোতেও স্লুইসগেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা যায়নি। এবারও ঠিক একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


নিউমার্কেটের দোকানি হাবিবুর রহমান বলেন, একটু বেশি বৃষ্টি হলেই প্রতিবার আমাদের দোকানগুলো ডুবে যায়। দোকানের মধ্যে হাঁটু সমান পানি জমে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়। বারবার সিটি কর্পোরেশনের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে সমাধানের দাবি করলেও তারা কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মনে হচ্ছে আমরা আবারও সেই একই ক্ষতির সম্মুখীন হবো। একটি রাজধানী শহরের প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেটের দোকান যদি মালামালসহ বারবার এভাবে পানিতে ডুবে যায়, তাহলে শহরের অন্য এলাকার বর্ষার অবস্থা কী দাঁড়ায়, তা সবাই অনুমান করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে এমনটা চললেও সিটি কর্পোরেশন আমাদের কোনো সমাধান দিতে পারছে না; আমরা বারবার কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হারাচ্ছি

আসন্ন বর্ষাকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ও উদ্যোগের বাস্তব চিত্র জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএসসিসির বর্তমান আয়তন ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী যেখানে অন্তত ১০টি পানি নিষ্কাশন পাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন, সেখানে আছে মাত্র ৩টি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ৩টির মধ্যে আবার হাতিরঝিলের গুরুত্বপূর্ণ পাম্পিং স্টেশনটি বর্তমানে অকেজো বা নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত পাম্পিং সক্ষমতা না থাকায় এবারও বর্ষায় ঢাকার দক্ষিণ অংশে চরম জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্ষার প্রস্তুতি হিসেবে ডিএনসিসি ইতোমধ্যে ২২১.৮৫ কিলোমিটার স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন এবং ১.৫৪৭ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করেছে। পাশাপাশি নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়নে ১১০.৯৩ কিলোমিটার রাস্তা ও ১০৫.৮৯ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হয়েছে। ডিএনসিসির আওতাধীন ২৯টি খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ কিলোমিটার; যার মধ্যে বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২৪ কিলোমিটার খাল পরিষ্কার ও খনন করা হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের একজন কর্মকর্তা তাদের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে জানান, উত্তর সিটির অধীনে মোট ৫টি পাম্পিং স্টেশন রয়েছে, যার মধ্যে ৩টি বড় এবং ২টি ছোট আকারের। বর্তমানে এই পাম্পিং স্টেশনগুলোর কার্যক্ষমতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া কল্যাণপুর রিটেনশন পন্ড (জলাধার) থেকে প্রায় ১.১২ লাখ ঘনমিটার স্লাজ বা কাদা-বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।


ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির কাজ নিয়মিত চলছে। তবে সার্বিক বিষয়ে স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার স্থানগুলো (হটস্পট) সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার এয়ারপোর্ট রোড ও মিরপুরসহ যেসব এলাকায় বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে, সেসব অঞ্চলে ড্রেন ও খালের পানিপ্রবাহ শতভাগ সচল রাখা হবে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে

এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজধানীর নিউমার্কেটের এক দোকানি হাবিবুর রহমান বলেন, একটু বেশি বৃষ্টি হলেই প্রতিবার আমাদের দোকানগুলো ডুবে যায়। দোকানের মধ্যে হাঁটু সমান পানি জমে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়। বারবার সিটি কর্পোরেশনের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে সমাধানের দাবি করলেও তারা কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মনে হচ্ছে আমরা আবারও সেই একই ক্ষতির সম্মুখীন হবো। একটি রাজধানী শহরের প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেটের দোকান যদি মালামালসহ বারবার এভাবে পানিতে ডুবে যায়, তাহলে শহরের অন্য এলাকার বর্ষার অবস্থা কী দাঁড়ায়, তা সবাই অনুমান করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে এমনটা চললেও সিটি কর্পোরেশন আমাদের কোনো সমাধান দিতে পারছে না; আমরা বারবার কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হারাচ্ছি।


একই ধরনের ক্ষোভ ও আশঙ্কা প্রকাশ করে মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা মাসুম আহমেদ রনি বলেন, বৃষ্টি হলেই যেন মিরপুরের এই এলাকাগুলো ডুবে যায়। এবারও নিশ্চিত করে বলা যায়, বর্ষা এলেই আমাদের এলাকা আবারও প্লাবিত হবে এবং হাঁটু পানি ভেঙে আমাদের চলাচল করতে হবে। প্রতি বছর যদি একই সমস্যা ফিরে আসে, তাহলে সিটি কর্পোরেশন কেন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না? রাজধানীর কোথায় কোথায় জলাবদ্ধতা হয় তা আমরাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই জানে, তার পরও কেন এর কোনো স্থায়ী সমাধান করছে না সিটি কর্পোরেশন?

গত ১৬ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, রাজধানীর জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের আওতায় বর্তমানে নর্দমা, বক্স-কালভার্ট ও খালসমূহ হতে পলি ও বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। ভারী বর্ষণের সময় জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো থেকে পোর্টেবল পাম্পের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান স্থায়ী পাম্প স্টেশনের সাহায্যে দ্রুত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যাচপিট ও লোহার গ্রেটিংস স্থাপন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পানি প্রবাহের বাধা (ব্লকেজ) নিরসন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হচ্ছে।
মধ্যমেয়াদি কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৪টি বৃহৎ খালের উন্নয়ন কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া জিয়া সরণি খাল ও শ্যামপুর খালের পানি নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য নতুন আউটলেট নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে নতুন নর্দমা নির্মাণ এবং বিদ্যমান নর্দমা সংস্কার ও মেরামতের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।


সবশেষে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের আওতায় গৃহীত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, জিয়া সরণি খাল, কাজলা খাল ও মৃধাবাড়ি খালসহ অন্যান্য খালের প্রায় ৫০ কিলোমিটার অংশ উন্নয়নের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া অবহেলিত এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়ক উন্নয়নের মহাপরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।


ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা এবং যত্রতত্র ম্যানহোলে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণেই মূলত পানি নিষ্কাশনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তবে আসন্ন বর্ষার প্রস্তুতি হিসেবে আগে থেকেই আমাদের সব ড্রেন ও নর্দমা পরিষ্কারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে এই কার্যক্রম নিয়মিত তদারকিও করা হচ্ছে।


ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার স্থানগুলো (হটস্পট) সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার এয়ারপোর্ট রোড ও মিরপুরসহ যেসব এলাকায় বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে, সেসব অঞ্চলে ড্রেন ও খালের পানিপ্রবাহ শতভাগ সচল রাখা হবে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকটের সার্বিক বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করলে সমাধান মিলবে। অন্যথায় শুধু টাকা খরচই হবে, কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে এটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে। কিন্তু ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে এখনও কোনো কাজ দৃশ্যমান নয়।
সান নিউজ/আরাফাত

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

বদলগাছীতে খাস আদায় হাটে অনিয়মের অভিযোগ, সরকারি রাজস্ব লোপাটের আশঙ্কা

নওগাঁর বদলগাছীতে হাট ও বাজারে সরকারি খাস খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বচ...

চৌকায় ২০ জন পুশইন ঠেকাল বিজিবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তে ২০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ...

জামায়াত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না: মুন্সীগঞ্জে মির্জা ফখরুল

মুন্সীগঞ্জে এক জনসমাবেশ ও পরিদর্শন কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসল...

শিশুদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগই জাতি গঠনের মূল : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়...

নওগাঁয় জাতীয় ফল ও আম মেলা নিয়ে বির্তক, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত তিনদিনব্যাপী জাতীয় ফল ও আম মেলা...

হামে শিশুমৃত্যু: গাফিলতির দায় এড়ানো যাবে না

দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ন...

কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: প্রাণ হারালেন সিলেটের ৫ বাংলাদেশি

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিকের...

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের যোগ দিবস উদযাপন

ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস (IDY) ২০২৬ উদযাপন করেছে।...

শিশু রিফাত হত্যা মামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড

বগুড়ার শাজাহানপুরে আট বছর বয়সী শিশু রিফাত হোসেন হত্যা মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত...

এক বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’, গেজেট প্রকাশ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর স্মৃতি ও সাহিত্যকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা