মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে যেখানে এক ডজন ডিম ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে এখন বিভিন্ন বাজারে তা ১৬৫ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রতি ডজন ডিমের দাম উঠেছে ১৮০ টাকায়।
ডিমের এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সাশ্রয়ী আমিষের উৎস হিসেবে নিয়মিত খাবারের তালিকায় থাকা ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজনের তুলনায় কম ডিম কিনছেন। কেউ কেউ খাবারের তালিকা থেকে ডিম বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে এক হালি ডিম কিনতে ভোক্তাকে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা গুনতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও একই পরিমাণ ডিমের দাম ছিল প্রায় ৪০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে এক হালি ডিমের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা।
বর্তমানে একটি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ টাকা। এই দামে এক হালি লেবুও কেনা যায় বলে তুলনা করছেন ক্রেতারা। এতে বাজারে ডিমের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির কারণে বিভিন্ন সময়ে বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে প্রান্তিক খামারিরা যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি খুচরা বিক্রেতারাও বাড়তি লাভ করতে পারেন না। সংকটের সময় মধ্যস্বত্বভোগীরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হন বলে তাদের অভিযোগ।
রাজধানীর মানিকনগর পুকুরপাড়ের মুদি দোকানের বিক্রেতা আসলাম শেখ বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা ডিমের সংকটের জন্য বন্যাকে দায়ী করছেন। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানে এতটা দাম বাড়ার পেছনে শুধু বন্যা দায়ী নয় বলে মনে করেন তিনি। তার দাবি, এর সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটও জড়িত।
এদিকে রোববার সকালে মুগদা বাজারে ডিম কিনতে গিয়ে দোকানির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান এক মধ্যবয়সী নারী। দোকানি এক হালি ডিমের দাম ৫৫ টাকা চাওয়ায় বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পরে ওই দোকান থেকে ডিম না কিনেই চলে যান।
কেন বাড়ছে ডিমের দাম
পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে ডিমের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। দেশে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। ফলে উৎপাদন বা সরবরাহে সামান্য ঘাটতিও বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, ডিমের দাম মূলত জোগান ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় দেশের বিভিন্ন এলাকার অনেক লেয়ার খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক খামারে মুরগি ও ডিম ভেসে গেছে বা নষ্ট হয়েছে। ফলে বাজারে হঠাৎ সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
তবে ডিমের বাড়তি দামের সুফল খামারিরা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন সাফির রহমান। তিনি বলেন, খামারিরা যে দামে ডিম বিক্রি করেন এবং ভোক্তারা যে দামে কেনেন, তার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। খামারিরা সরাসরি ভোক্তার কাছে ডিম বিক্রি করতে না পারায় মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভবান হন। অথচ বাড়তি দামের দায় অনেক সময় খামারিদের ওপর পড়ে।
বিপিআইএর তথ্য অনুযায়ী, খামার পর্যায়ে বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা। অথচ অনেক খামারি প্রায় ৬ টাকা দরে ডিম বিক্রি করছেন। ফলে প্রতিটি ডিমে প্রায় ৪ টাকা লোকসান হচ্ছে তাদের।
সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। এতে পোলট্রি শিল্পের মূল চালিকা শক্তি প্রান্তিক খামারিরা সংকটে পড়েছেন। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন বলেও দাবি করেছে বিপিআইএ।
এর আগে গত জুলাইয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পোলট্রি মুরগি ও ডিমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে মহাসড়কে ডিম ভেঙে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান খামারিরা।
সান নিউজ/ হুমায়রা