শরীর সুস্থ রাখা, পেশি গঠন ও ফিটনেস ধরে রাখতে অনেক তরুণ নিয়মিত জিমে গিয়ে ভারোত্তোলন করেন। তবে দ্রুত পেশি বাড়ানোর আশায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই টেস্টোস্টেরন বা অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে এ ধরনের হরমোন ব্যবহারের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
শুক্রাণু উৎপাদন কমতে পারে কেন?
টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু উৎপাদন মস্তিষ্ক এবং অণ্ডকোষের মধ্যে থাকা একটি জটিল হরমোন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক অণ্ডকোষকে উদ্দীপিত করার প্রয়োজন কম মনে করতে পারে। ফলে লুটিনাইজিং হরমোন (এলএইচ) ও ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন (এফএসএইচ)-এর উৎপাদন কমে যেতে পারে।
এই দুই হরমোন স্বাভাবিক অণ্ডকোষের কার্যক্রম ও শুক্রাণু তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বাইরে থেকে অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন গ্রহণের কারণে অণ্ডকোষের নিজস্ব টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু উৎপাদন কমে যেতে পারে।
বেশি টেস্টোস্টেরন মানেই কি বেশি প্রজনন ক্ষমতা?
অনেকের ধারণা, শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি থাকলে প্রজনন ক্ষমতাও বেশি হয়। বাস্তবে রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এবং শুক্রাণু উৎপাদন এক বিষয় নয়।
চিকিৎসকদের মতে, কোনো পুরুষের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি থাকলেও তার শুক্রাণুর সংখ্যা কম হতে পারে। বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণের ফলে রক্তে হরমোনের মাত্রা বাড়লেও অণ্ডকোষে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই টেস্টোস্টেরনকে প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েডও একইভাবে প্রজনন স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলো এলএইচ ও এফএসএইচের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতিশীলতা কমতে পারে এবং অণ্ডকোষের আকারও ছোট হয়ে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বীর্যে কোনো শুক্রাণু না থাকার অবস্থাও তৈরি হতে পারে, যাকে অ্যাজুস্পার্মিয়া বলা হয়।
স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগতে পারে?
টেস্টোস্টেরন বা অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহার বন্ধ করলেই প্রজনন ক্ষমতা সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যায় না। একটি নতুন শুক্রাণু তৈরি হতে সাধারণত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। তাই হরমোনের প্রভাবে কমে যাওয়া শুক্রাণু উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
কতদিনে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা সম্ভব, তা নির্ভর করে কতদিন এবং কী মাত্রায় হরমোন বা স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়েছে তার ওপর। অনেকের ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে উন্নতি দেখা যেতে পারে। তবে কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর কারও কারও ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাও কঠিন হতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, শুক্রাণু উৎপাদন কমে গেলেও সবসময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে একজন তরুণ নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ মনে করলেও তার শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যেতে পারে। অনেক সময় সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করার পর বিষয়টি ধরা পড়ে।
প্রজনন ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে
জিমে যাওয়া বা ভারোত্তোলন করা নিজে কোনো সমস্যা নয়। সুষম খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্যকরভাবে পেশি গঠন করা সম্ভব।
মূল উদ্বেগের বিষয় হলো চিকিৎসকের যথাযথ পরামর্শ ও তত্ত্বাবধান ছাড়া টেস্টোস্টেরন বা অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহার করা। বিশেষ করে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে এসব হরমোন ব্যবহারের আগে সম্ভাব্য প্রজননগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ।
টেস্টোস্টেরন থেরাপি নেওয়ার কথা ভাবলে শুরু করার আগে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের সঙ্গে নিজের প্রজনন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। ফিটনেসের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রজনন স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সান নিউজ/ রাব্বি