ব্যস্ত জীবনে কাজের চাপ কিংবা নানা কারণে অনেকেই ঘুমের সময় কমিয়ে দেন। অথচ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখতে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে ঘুমের সময়, মান ও নিয়মিততার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঘুমের ঘাটতিই নয়, অতিরিক্ত ঘুমও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তান ধারণের চেষ্টা করা দম্পতিদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের সঙ্গে সন্তান ধারণের সক্ষমতার সম্পর্ক অনেকটা ‘ইউ’ আকৃতির। অর্থাৎ খুব কম বা খুব বেশি—দুই ধরনের ঘুমই প্রজনন সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ছয় ঘণ্টার কম বা নয় ঘণ্টার বেশি ঘুম সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সন্তান ধারণে সময় লাগা এবং কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতির ফলাফল নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় প্রায় সাত থেকে সাড়ে আট ঘণ্টা ঘুমকে তুলনামূলক উপযোগী সময় হিসেবে পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ বেশি সময় ঘুমালেই বেশি উপকার মিলবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পর্যাপ্ত ঘুম প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী হতে পারে।
কখন ঘুমাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু ঘুমের সময়কাল নয়, ঘুমানোর সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। রাতে দেরিতে ঘুমিয়ে সকালে দেরিতে উঠলে মোট আট ঘণ্টা ঘুম হলেও তা শরীরের জন্য সবসময় একই ধরনের প্রভাব ফেলবে—এমনটা নয়।
চিকিৎসকদের মতে, ডিম্বস্ফোটনের সঙ্গে যুক্ত লুটিনাইজিং হরমোন বা এলএইচের নিঃসরণে ঘুমের ভূমিকা রয়েছে। তাই রাতের ঘুমের সময় নিয়মিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
দেরিতে এবং অনিয়মিত সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস ডিম্বস্ফোটন নিয়ন্ত্রণকারী এলএইচ ও এফএসএইচ হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত ঘুম শরীরের জৈবিক ছন্দ ঠিক রাখতে এবং হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।
রাতের শিফটে কাজ করলে
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা নিয়মিত রাতের শিফটে কাজ করেন, তাদের সন্তান ধারণে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে। এ ছাড়া মাসিকের অনিয়ম এবং অন্যান্য প্রজননসংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ
পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্যও পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় শরীরে টেস্টোস্টেরনসহ বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলে। নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এবং শুক্রাণুর মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া ঘুমের ঘাটতির কারণে শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। এতে নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজনন-সংশ্লিষ্ট হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কী পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে প্রতিদিন প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। সম্ভব হলে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস করা ভালো।
শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। বারবার ঘুম ভেঙে গেলে দীর্ঘ সময় বিছানায় থাকলেও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নাও হতে পারে। রাতের শিফটে কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন বজায় রাখা এবং ঘুমের সময় ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ম্যাগনেশিয়াম বা মেলাটোনিনের মতো কোনো সাপ্লিমেন্ট ঘুমের জন্য ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নিজে থেকে কোনো সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ শুরু না করাই নিরাপদ।
সব মিলিয়ে, সন্তান ধারণের সক্ষমতার সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত, মানসম্মত ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।
সান নিউজ/ রাব্বি