দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর বড় একটি অংশ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফায় শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে বাড়তি আয়, পাশাপাশি ফি, কমিশন ও অন্যান্য খাতের আয় বৃদ্ধিই এ প্রবৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ব্যাংকিং খাতের পুরো চিত্রটি একরকম নয়। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তুলনামূলক বেশি, তাদের বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা কমেছে, আবার কিছু ব্যাংকের লোকসানও বেড়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) পর্যন্ত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৩১টি জানুয়ারি-জুন সময়ের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বাকি পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ বা মার্জার প্রক্রিয়ায় থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না।
প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম ছয় মাসে ১৭টি ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে সাতটি ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। ছয়টি ব্যাংকের লোকসান আরও বেড়েছে এবং একটি ব্যাংক আগের বছরের মুনাফা থেকে এবার লোকসানে চলে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কম খেলাপি ঋণ, স্থিতিশীল আমানত প্রবৃদ্ধি, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে ভালো আয় এবং তুলনামূলক শক্তিশালী সুশাসন—এসব বৈশিষ্ট্য যেসব ব্যাংকের রয়েছে, তারা চলতি বছরের প্রথমার্ধে ভালো ফল করেছে।
ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর থাকায় অনেক ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমেছে। সেই অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম এবং এর বিপরীতে ঋণের মতো উচ্চ হারে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হয় না। ফলে কম খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলো এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে নিরাপদে আয় বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের ভাষ্য, ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলে খেলাপি ঋণই বড় পার্থক্য তৈরি করেছে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম, তারা উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পেরেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ বেশি থাকা ব্যাংকগুলোকে একই সঙ্গে সুদ আয়ের ক্ষতি এবং উচ্চ প্রভিশনের চাপ সামলাতে হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ নিট মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ সময় ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রথমার্ধে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ২৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৬ কোটি টাকা হয়েছে। একই সময়ে বিনিয়োগ আয় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা এসএমই খাতে শক্তিশালী অবস্থান, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ থেকে বাড়তি আয় এবং তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
জুন শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ২ দশমিক ২৭ শতাংশ।
রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আকরামুল আলমের মতে, কম ব্যয়ে আমানত সংগ্রহ এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার কারণে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে।
প্রথম ছয় মাসে ৬৮৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। আগের বছরের তুলনায় ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে ১৯ শতাংশ।
তবে মুনাফা বাড়লেও ব্যাংকটির নিট সুদ আয় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে বিনিয়োগ আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কমিশন, ব্রোকারেজ ও ফি-ভিত্তিক আয় বৃদ্ধিও মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে সিটি ব্যাংকের সমন্বিত নিট মুনাফা ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৫২৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা হওয়া এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৩২১ শতাংশ বেড়ে ৪৪২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
যদিও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নিট সুদ আয় ২১ শতাংশ কমেছে, বিনিয়োগ আয় ৫২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪২২ কোটি টাকা হওয়ায় সামগ্রিক মুনাফায় বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে।
এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের নিট মুনাফা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৪৩৯ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকের মুনাফা ৬ শতাংশ বেড়ে ৪৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ দুই ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ আয় বৃদ্ধির প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় মুনাফা বাড়িয়েছে যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), এনআরবিসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক এবং এসবিএসি ব্যাংক।
অন্যদিকে ব্যাংক এশিয়া, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ঢাকা ব্যাংকের মুনাফা কমেছে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফলের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটি ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া এবং অন্যান্য ব্যাংকে রাখা প্লেসমেন্ট থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামের মতে, ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক মুনাফার বড় অংশ এসেছে জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে।
তার মতে, ব্যাংকের জন্য সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংকিং ব্যবসার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ব্যাংকের আমানত যদি উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হয়ে প্রধানত সরকারি খাতে যায়, তাহলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব সীমিত থাকে।
তিনি আরও মনে করেন, ব্যাংকগুলো এভাবে স্বল্পমেয়াদে ভালো মুনাফা করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের বিনিয়োগনির্ভর মডেল টেকসই নাও হতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরীর মতে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান নিয়ম ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর জন্য নগদ রিজার্ভ অনুপাত (সিআরআর) এবং সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (সিএলআর) নির্ধারণ করে দেয়। একইভাবে ঋণ ও আমানতের ব্যবস্থাপনায়ও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যাংক নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছে। এমনকি যেখানে মোট আমানতের বিপরীতে নির্ধারিত ঋণ বিতরণের সীমা ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত, সেখানে কোনো কোনো ব্যাংক ১০০ শতাংশেরও বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।
ফলে ব্যাংকগুলোর বর্তমান আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু মুনাফার পরিমাণ দেখলেই হবে না; খেলাপি ঋণ, প্রভিশন, আমানতের ব্যয়, ঋণ বিতরণ এবং সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ধরনও বিবেচনায় নিতে হবে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক হলেও এর পেছনের কারণগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ থেকে বাড়তি আয় একদিকে ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কম থাকলে অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও প্রভিশনের চাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নির্ভর করে শুধু মুনাফার অঙ্কের ওপর নয়। ঋণের মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করাই ব্যাংকিং খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।