ফিচার

হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির শিল্পী বাবুই পাখি

মোঃ শাহ্ আলম টুকু, বাগেরহাট

আবহমান কাল থেকে গ্রাম বাংলার উচু তাল গাছে দল বেধে বাসা বা্েঁধ বাবুই পাখি। এখন আর তাল গাছে সহসা দেখা মেলেনা বাবুই পাখির বাসা। চোখে পড়েনা বাবুই পাখি। গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক সৃষ্টি বাবুই পাখির বাসা। একদিকে গাছিরা বাঁশ বেধে তাল গাছের মোচা থেকে মিষ্টি রস আহরনসহ গাছ কেটে উজাড় করা, শিকারীদের অত্যাচার , খাদ্যের অভাব সহ নানা কারনে এখন আর সহসাই তাদের বাসা দেখতে পাওয়া যায় না । এভাবেই হারিযে যাচেছ শিল্পী পাখি বাবুই বলে দাবী পাখি বিশেষজ্ঞদের।


বাগেরহাটের এভারগ্রীন বার্ড পার্র্র্র্র্র্ক এর মালিক ও পাখি বিশেষজ্ঞ মোঃ ফজলুল করিম জানান,পাখি শুধু প্রকৃতির অলংকারই নয়, পাখি প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এক অতিপ্রয়োজনীয় প্রাণী। পাখিকে বাদ দিয়ে এই সবুজ পৃথিবী কল্পনা করা অসম্ভব। আমাদের দেশে নানা পাখির সমারহ রয়েছে । এদের মধ্যে বাবুই পাখি একটি আলোচিত পাখি । বাবুই পাখি দেখতে স্ত্রী চড়ুই পাখির মত। গায়ের পালকের রঙ খয়েরি। বসন্ত ঋতুতে পুরুষ বাবুই দেখলে মনে হয় একটু সাজগোজ করেছে। মনেহয় যেন গায়ে হলুদ মেখে পালকগুলো হলুদ বানিয়েছে এবং গলায় গারো রঙ মেখেছে। স্ত্রী বাবুইদের রঙ কিš‘ কোন সময়েই বদলায় না। শীতকালে স্ত্রী ও পুরুষ বাবুইয়ের চেহারা একই রকম দেখতে। উপরের পালক লালচে হলুদ, তার ওপর কালচে পাটকিলের ছোটছোট টান। এই টান কোমরের কাছে এসে শেষ হয়েছে। ঘারে লালচে পালকসহ ডানা এবং লেজ গাঢ় পাটকিলে। চোখের উপরেও একটা টান। মাথা ও বুক একটু গাঢ় লালচে হলুদ। লম্বা ছয় ইঞ্চি।


বাবুই পাখির ইংরেজী নাম উইভার ( বিধাবৎ ইরৎফ)। বৈজ্ঞানিক নাম পাসিউস ফিলিপপিনাস। চড়ুই পাখিদের মত বাবুইরা ঘাসের বীজ ও শষ্যদানা খেয়ে পেট ভরে। ঠোঁটের গোড়ায় পোকা মাকড় পেলেও ছাড়ে না। ছানাদের শস্যের ক্ষতিকারক কিটপতঙ্গ খাইয়ে বড় করে।ফলে শস্য খেয়ে কৃষকের যেটুকু লোকসান করে তা শস্যের ক্ষতিকারক কিটপতঙ্গ মেরে ফেলায় পুরণ হয়ে যায়।


বাবুইকে অনেকে দেখে না চিনলেও বাবুই পাখির বাসা চেনে প্রায় সকল মানুষই। বসন্ত ঋতুতে পুরুষ বাবুই পাখি যখন হলুদ পোষাক গায়ে চাপায় তখন ছাড়া এদের দেখে মনে হয় বুঝি চড়ুই পাখির ঝাঁক। এ কারণেই মানুষের নজরে পড়ে না। ঘনজঙ্গল ওদের একদম অপছন্দের । ফসলের খেত, মাঠ অথবা একটু স্যাঁতসেঁতে জলাজমির ধারে বাবলা তাল, সুপারী খেজুর, ওমাদার গাছের উচু ডালে এরা বাসা বাঁধে। এ ছাড়া বাসা বাঁধে জলের ওপর যে গাছ ঝুলে পড়েছে সেই গাছে। না হয় যে গাছে কাঁটা আছে কিংবা সহজে যে গাছ বেয়ে ওঠে কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। বাসা করতে পছন্দ করে সেই ডাল বা গাছ যেখানে হাওয়া বা ঝড়ের বেগ কম লাগে। বাসা দেখলে মনেহবে পাকা আবহাওয়া বিশারদের মত কাজ। যেদিক হতে বেশি ঝড় বা বাতাস বহা সম্ভব, এরা বাসার সরুমুখগুলোকে তার বিপরীত দিকে রাখে।তবে তাল গাছে বেশি বাসা বাধতে দেখা যায়। বাবুইদের বাসা দেখতে যেন জল রাখার ছোট কুজোর মত। কুজোর গলা নিচের দিক করে ঝুলালে যে রকম দেখায়, বাবুইদের বাসা যেন সেই রকম। তাল, নারিকেল ও খেজুর গাছের আঁশ দিয়ে বাবুইয়া বাসাগুলোকে এমন সুন্দরভাবে তৈরি করে যে তা দেখলে অবাক হতে হয়। একজন কারু শিল্পীর পক্ষে এই রকম নিপুণ কাজ অসম্ভব। বাসা তৈরির সময় গরমকাল থেকে বর্ষাকাল। এই সময় বাবুইরা মাঠে কিংবা জঙ্গলেগিয়ে ঠোঁট দিয়ে তাল-খেজুরের আঁশ যোগার করে আনে। এই আঁশ প্রথমে গাছের ডালে আটকিয়ে বাসা ঝুলাবার দড়ি তৈরি করে। দড়ি ঝুলানোর কাজ শেষ হলে বাবুইরা আসল বাসা বাঁধতে শুর“ করে। প্রথমে বাসার চেহারা হয় দড়িতে ঝুলানো একটা ঘন্টা বা ছাতার মত। এই ঘন্টার নিচে এক গাছি শক্ত খড়ের দড়ি দাঁড়ের মত লাগানো দেখা যায়। বাবুইরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে সেই ছাতার এলাকার দড়িতে ঝুলে বিশ্রাম করে এবং গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। অনেকের ধারণা স্ত্রী বাবুই যখন মন দিয়ে বাসা বোনে, তখন মিয়া সাহেব দোল খেয়ে গান শুনিয়ে বউয়ের মন খুশি রাখে।


বাবুইরা ভারী ষ্ফূর্তিবাজ পাখি। বাসা তৈরি শেষ হয়ে গেলে এদের আনন্দের আর সিমা থাকে না। তখন তারা কি করবে ভেবে না পেয়ে উড়ে উড়ে শূন্যে ডিগবাজি খেতে আরম্ভ করে কখনও বা আনন্দে পরষ্পর কামড়া কামড়ি আরম্ভ করে। অন্য পাখিরা যেমন বাসায় যেতে প্রথমে উড়ে এসে বাসার কাছের একটি ডালে বসে এবং তারপর ধীরে সুয়ে বাসার ভিতর যায়। বাবুইরা তা করে না। এরা উড়তে উড়তে বাসার তলার শুঁড়ের মত পথ দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। অন্য কোন পাখির পক্ষে এটা সম্ভব নয়।


কখনও কখনও বাবুই পাখি জোনাকী পোকা ধরে এনে ঘরে আলো জ্বালে । বাসা মনের মত না হলে নতুন বাসা তৈরি করে। বাবুইদের বাসা গাছ থেকে পড়ে গেলে, বাসার সরু খড়কুটো দিয়ে লোকে বালিশ তৈরি করে। এ বালিশ তুলো ভরা বালিশের মতই নরম হয়। স্ত্রীবাবুই পাখির আধিক্যের জন্যেই হয়ত বাবুই বংশ বিস্তার রক্ষা পায়। স্ত্রী বাবুই ডিম পাড়ে দুটি বা তিনটি। ডিমে তা দেয়া এবং ছানাদের যত্ন তাকেই করতে হয়।

মানুষের অত্যাচার আর অনাচার থেকে রক্ষাপেতে লোকালয় ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে দেখা যা”েছ অনেক বাবুইদের । বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন হিরণ পয়েন্টে ট্যুরিজম এলাকার প্রতিটি তালগাছে শ’শ বাবুই পাখি বাসা বাধে। সেখানে নৌবাহিনী অফিসের বাম পাশের গেট দিয়ে মংলা বন্দর রেষ্ট হাউজ এলাকায় ঢুকতে চোখে পড়ে তাল গাছের প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে আছে বাবুই পাখির বাসা। এখানে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে বাবুই পাখিরা বাসা বাধে বলে ধারণা করা হয় ।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ধরা পড়ে মাদক বহনকারীরা, সংসদে যায় কারবারিরা

মাদক মামলায় বারবার কেবল বাহক বা বহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও মূল কারবারিরা বিচারে...

দেশে গড়ে প্রতিদিন ১০ খুন, বাড়ছে ছিনতাই-ডাকাতি

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সং...

মেধাবী উদ্যোক্তারা পাবেন ৫ কোটি টাকা: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দি...

সুন্দরবনের ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর ২৭ সদস্যের আত্মসমর্পণ  

অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে কোস্টগার্ডের কাছে আত্নসমর্পণ করেছে সুন্দরবনের বনদস্যু...

জুনে সড়কে ঝরল ৪৬৩ প্রাণ, শীর্ষে চট্টগ্রাম

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত রয়েছে। গত জুন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থ...

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে রাতেও চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে রাজধানীতে দিনভর বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ ক...

সুন্দরগঞ্জে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় আমন ধানের বীজতলা ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি

টানা ভারি বর্ষণে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে...

গাইবান্ধার চরাঞ্চলে মূল্যবান ভারী খনিজ বালু আহরণের কর্মযজ্ঞ

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান ভারী খন...

‘মান্নাত’ নিয়ে আইনি জটিলতার অবসান শাহরুখ খানের 

বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ‘মান্নাত’ নিয়ে চলা আইন...

৭ বছর পর বড় পর্দায় ফিরছেন গোবিন্দ 

নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা গোবিন্দ দীর্ঘ সাত বছরের বিরতি শেষে আবারও...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা