আবু রাসেল সুমন : পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষবরণকে ঘিরে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব "বৈসাবি" উদযাপন কে সামনে রেখে খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় চলছে শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি।
চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষকে বরণ করে নিতে পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় প্রতিবছর তাদের এই প্রধান সামাজিক উৎসব "বৈসাবি" খুব জাঁকজমক ভাবে উদযাপন করে থাকে। এ উপলক্ষে পাহাড়ের আনাচে কানাচে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সাজ সাজ রব বিরাজ করছে।
বরাবরের মতোই বিদায়ী বছরের সব দুঃখ-কষ্ট আর গ্লানি পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে নতুন বছরের পথচলা শুরু করেছে পাহাড়, নদী আর অরণ্যঘেরা জনপদের মানুষ। বর্ষবরণ ও বিদায়ের অনুষ্ঠান "বৈসাবি"কে ঘিরে আগাম উৎসবের আমেজ এখন তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদে।

"বৈসাবি" মূলত বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। খাগড়াছড়ি জেলার প্রধান তিন ক্ষুদ্র - নৃগোষ্ঠী ত্রিপুরা সম্প্রদায় - বৈসু, মারমা সম্প্রদায় - সাংগ্রাই এবং চাকমা সম্প্রদায় -বিজু নামে এ অনুষ্ঠান পালন করে। এ ছাড়া পার্বত্য রাঙামাটি এবং বান্দরবান জেলার অন্যান্য সম্প্রদায় বর্ষবরণের এ অনুষ্ঠান ভিন্ন নামে পালন করে। বৈসাবি শব্দটি মূলত তিন সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত।
পাহাড়ের একেক সম্প্রদায়ের কাছে ভিন্ন নামে ও নিজ নিজ ভাষায় পরিচিত এই "বৈসাবি" যেমন- বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু।
"বৈসাবি"র প্রস্তুতি হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলা শহরসহ প্রতিটি উপজেলার হাটবাজার গুলোতে বেড়েছে মানুষের উপস্থিতি। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নিজেকে সাজাতে বিভিন্ন শপিংমল কাপড়ের দোকান গুলো কানায় কানায় পরিপূর্ণ।
স্থানীয় এক বিক্রেতা জানান, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবছর উৎসবের আমেজ একটু আগেই থেকেই জমে উঠেছে। এবারের বাজারে মানুষের সমাগম অনেক অনেকাংশেই বেশি। শুধু কেনাকাটাই নয়, উৎসব উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরাও ভিড় জমাচ্ছেন এখন থেকেই।
সরেজমিনে বাজার গুলো ঘুরে দেখা যায়, উপজাতীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক যেমন, চাকমাদের পিনোন-হাদি, মারমাদের থামি এবং ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসার দোকানে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক নকশার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বুননের পোশাকের চাহিদাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
উৎসবে বিশেষ খাবারের উপকরণ কিনতে ভিড় করছেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষজন। উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে "পাঁচন" বহু ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য বাজারে উঠতে শুরু করেছে বাঁশকোড়ল, তারা, বিভিন্ন পাহাড়ি আলু ও বুনো সবজি। স্বাদের ভিন্নতা আনতে অনেকে এতে শুকনো মাছ (সিদল) ব্যবহার করেন, যদিও নিরামিষভাবেও এটি প্রস্তুত করা হয়। এই ঐতিহ্যবাহী খাবার বৈসাবির সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
"বৈসাবি" উৎসবকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতে জেলা পরিষদের উদ্যােগে নেয়া হয় মেলার আয়োজন, পাশাপাশি এসব মেলায় ঘিলা খেলা, বলি খেলার মতো ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় আনন্দে মেতে উঠে কিশোর- কিশোরী, তরুন-তরুনীরা।
আগামী ১২ এপ্রিল ‘ফুল বিজু’র মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। এদিন চেঙ্গি নদীর পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের গ্লানি মুছে ফেলার প্রতীকী আয়োজন করা হবে। ১৩ এপ্রিল মূল বিজু বা বৈসু উপলক্ষে ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না ও অতিথি আপ্যায়ন অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ এপ্রিল গজ্যাপজ্যা বা সাংগ্রাই উপলক্ষে জলকেলির মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা হবে।
কিরন বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকি বৈসু অনুষ্ঠানের। এ বছর বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থা চলছে। পৃথিবীর সকল মানুষের শান্তি ও মঙ্গল প্রয়োজন। সেই মঙ্গল কামনা করেই আমরা এবার বৈসু শুরু করতে যাচ্ছি। আগামী ১৩ এপ্রিল হারিবৈসু দিয়ে আমাদের মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে।
উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ। পর্যটন কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।
সান নিউজ/আরএ