খাদের কিনারায় থাকা আবাসন বাজার চাঙ্গা করতে এবং শ্লথ হয়ে পড়া অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বেইজিং সম্প্রতি যে সমস্ত নতুন নীতি বা উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিয়ে বাজারে তেমন কোনো উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত সাদামাটা এবং চীনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির যে মাঝারি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা কোনোমতে টেনেটুনে পূরণ করা ছাড়া এগুলো বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না।
আসলে এই সমালোচনার পেছনে গভীর একটি সংকট লুকিয়ে আছে, যা হলো চীন যেভাবে তাদের অর্থনৈতিক সফলতার পরিমাপ করে। প্রতি বছরের শুরুতে একটি নির্দিষ্ট জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা এবং বছর শেষে তা কেবল ছুঁয়ে দেখাকেই নিজেদের সাফল্য হিসেবে ধরে নেওয়ার মানসিকতাই আজ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার অন্ধ অনুকরণ থেকে বেইজিংয়ের এবার বেরিয়ে আসা উচিত।
নতুন এই আবাসন প্যাকেজে সাবসিডিযুক্ত ঋণ এবং নির্দিষ্ট কিছু খাতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হলেও বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মন জয় করতে তা ব্যর্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত কয়েক বছর ধরে ধুঁকতে থাকা প্রপার্টি বাজারকে টেনে তোলার জন্য নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও তার সুফল সীমিত। ২০০৭-২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রও যেমন বারবার চেষ্টা করে অবশেষে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে এনেছিল, তেমনি নতুন চেষ্টার মধ্যে ভুল কিছু নেই।
তবে এর চেয়েও বড় সত্য হলো, বিনিয়োগকারীরা এখনো এই বাস্তবটি মেনে নিতে পারেননি যে বর্তমান চীন আর আগের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ নয়। সামনের দিনগুলোতে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও মন্থর ও পরিমিত হবে। সরকারের বার্ষিক জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা এই কঠিন রূপান্তরের গতিকে কিছুটা গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করলেও এটি অনেক সময় একরকম ফাঁদে পরিণত হয়।
সংখ্যাটিকে সফলতার একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেলায় মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করার বদলে শুধু লক্ষ্য ছোঁয়ার পণ করেন নজিরধারীরা।
২০০৮ সালের মতো বড় ধরনের কোনো বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজের ইঙ্গিত এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না। তার মানে এই নয় যে নতুন কোনো নীতিগত ধাক্কার প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন একটি সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। বর্তমানে প্রতি ত্রৈমাসিকের তথ্যগুলো একই চিত্র তুলে ধরে—শক্তিশালী রপ্তানির বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
গত ত্রৈমাসিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪.৩ শতাংশ, যা শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত সাড়ে চার থেকে পাঁচ শতাংশ লক্ষ্যের সামান্য নিচে। বিশ্লেষকরা প্রতিবারই বড় অঙ্কের সরকারি ব্যয়ের পরামর্শ দিলেও পিপলস ব্যাংক অব চায়না স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা তাড়াহুড়ো করতে নারাজ। এই নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলো অনেক সময় অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থাকে পরিষ্কারভাবে মূল্যায়ন করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। লক্ষ্য পূরণ হলে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, আর না হলে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। পুরো আলোচনাটাই তখন ঘুরপাক খায় ওই একটি নির্দিষ্ট অঙ্ককে ঘিরে।
অবশ্য বেইজিং একা দোষী নয় । যারা বাইরে থেকে চীনের অর্থনীতি মূল্যায়ন করেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানো দরকার। অর্থনীতি ভালো বা খারাপ যাই করুক না কেন, তা কেবল একটি সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলো কি না তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বহু বছর ধরে আশা করা হয়েছিল যে চীন তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর জোর দেবে, যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতিকে বুঝতে হলে চিরাচরিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। ক্যাডারদের ভবিষ্যৎ অনুমান বা অনুমানের ওপর ভর করে আর যাই হোক, অর্থনীতির সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। যতদিন না এই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে, ততদিন চীনের অর্থনীতি আসলেই ভালো করছে, নাকি কেবল ধুঁকে ধুঁকে চলছে, তা নিরপেক্ষভাবে বিচার করা অসম্ভব।
সান নিউজ / রাজীব