ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং শিগগিরই এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার (১৫ জুন) ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলাপের সময় এ কথা জানান তিনি।
চুক্তির কিছু বিষয় সামনে এনেছেন মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার (১৯ জুন) থেকেই হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া হবে।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তিনটি মূল স্তম্ভকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তাকে এক নতুন নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে।
যিনি ইরানকে মোকাবিলার বিষয়টিকে ইসরাইলের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন, সেই নেতানিয়াহু কীভাবে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন– যেখানে ইরানই বরং যুদ্ধের আগের চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে?
সোমবার ইসরাইলের সংসদ নেসেটে, বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন,
তার সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা; হয় আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্রের সঙ্গে সরাসরি ও মারাত্মক সংঘাত, অথবা ইসরাইলি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, রোববার (১৪ জুন) বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু কোনো বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেননি।
নিজের রাজনৈতিক দল লিকুদ এবং জোট সরকারের কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের মন্তব্যেও নেতানিয়াহুর ওপর চাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে তেহরানের এ দাবির বিষয়ে যে, যুদ্ধবিরতির আওতায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান’ বন্ধ থাকবে।
ইসরাইলের কট্টরপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের বাধ্য করে না। আমরা সে চুক্তির অংশীদার নই, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেন,
আমেরিকানরা কেন এটি গ্রহণ করল তা বোঝা কঠিন। লেবাননে কী ঘটবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা ইরানকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে হিজবুল্লাহকে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার এবং লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহকে প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে।
নেতানিয়াহু নিজেও এখন অনেকটা নীরব। নিজেকে প্রায়শই জয়ী হিসেবে দাবি করতে অভ্যস্ত নেতানিয়াহুর এ নীরবতাকে তার কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকেই। গাজায় হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল আরও আক্রমণাত্মক হওয়া, অর্থাৎ ঝুঁকিগুলোকে আটকে না রেখে সেগুলোকে আগেভাগেই নির্মূল করা।
কিন্তু ইসরাইলি বাহিনী গাজার অনেক এলাকা ধ্বংস করা এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা সত্ত্বেও হামাস এখনো অর্ধেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিজেদের শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।
অন্যদিকে আট মাস আগের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঝুলে আছে। নেতানিয়াহুর এ নতুন নিরাপত্তা কৌশল ইসরাইলি বাহিনীকে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখলে আটকে ফেলেছে। এটি অনেক ইসরাইলির কাছে জনপ্রিয় হলেও, এর কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক সমাধান নেই। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ যুদ্ধ ইসরাইলের সামরিক সম্পদ ও রিজার্ভ বাহিনীকে চরম ক্লান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বারবার সংঘাতে জড়ানো সত্ত্বেও নিজের প্রধান শত্রুদের এখনও নির্মূল করতে পারেনি ইসরাইল। বরং তেহরানকে আরও বেশি কট্টরপন্থি নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছে, যারা মার্কিন-ইসরাইলি শক্তির ভয় থেকে মুক্ত এবং হরমুজ প্রণালীতে তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে। এছাড়া ইসরাইলের প্রধান শত্রু নিজেই ইসরাইলের মূল মিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলেও এখন দেখা যাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ এর সিনিয়র ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘ইসরাইলের এই ব্যর্থতা তেহরান-বিষয়ক কৌশল পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তাদের আরও বাস্তবসম্মত ও সংযত অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন যদি মনে করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ চুক্তিটি ভেস্তে দেয়ার প্রচেষ্টা, তবে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
ওবামা প্রশাসনের সময় নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে কংগ্রেস ও মার্কিন জনমতের মাধ্যমে নিজের কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ প্রায় নেই।
সূত্র: বিবিসি
সান নিউজ/ জামান