ইরানে বর্তমানে একক কোনো ধর্মীয় নেতা আর সর্বোচ্চ ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। দীর্ঘদিনের ক্ষমতা কাঠামোর এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন একজন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। তিনিই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটি বেশ কয়েকদিন সর্বোচ্চ নেতা শূন্য ছিল। পরে আলি খামেনির ছেলে মোজতবাকে নতুন নেতা নির্বাচন করা হলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মোজতবাই এখনো ক্ষমতার শীর্ষে আছেন। তবে তাঁর ভূমিকা এখন শুধু জেনারেলদের নেওয়া সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিজে কোনো নির্দেশ দিচ্ছেন না। ইরানি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সামরিক কৌশল ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত- দুটিই মূলত আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে।
পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তার কথাতেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার নানা বিষয় সম্পর্কে জানেন। নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরানিরা প্রতিক্রিয়া দিতে খুব সময় নিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো সেখানে আর নেই। কিছু ক্ষেত্রে জবাব দিতে তাদের ২ থেকে ৩ দিন সময় লাগছে।
তবে মোজতবার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে নতুন নেতা সামনে আসছেন না। তিনি আইআরজিসির কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বা সীমিত অডিও যোগাযোগের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করছেন।
যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের হাতেই আসল ক্ষমতা
গত সোমবার ওয়াশিংটনের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রগুলোর মতে, এতে ধাপে ধাপে আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ না মেটা পর্যন্ত ইরান পারমাণবিক ইস্যু আলোচনার বাইরে রাখতে চায়। এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান ঠিক বিপরীতে।
ইরান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আইয়ার বলেন, দুই পক্ষের কেউই আলোচনায় বসতে চায় না। উভয়পক্ষই মনে করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষ দুর্বল হবে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব খাটিয়ে, আর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধের মাধ্যমে একে অপরকে দুর্বল করতে চাইছে।
আইয়ার বলেন, আপাতত কোনো পক্ষই ছাড় দেওয়ার অবস্থায় নেই। আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নিজেদের দুর্বলতা দেখাতে রাজি না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের কাছে নমনীয় হয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষতি এড়াতে চাইছেন।
অ্যালান আইয়ার বলেন, তেহরানের এই সতর্ক অবস্থান শুধু বর্তমান পরিস্থিতির চাপ নয়, এটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা চর্চারও প্রতিফলন। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, প্রকৃত ক্ষমতা এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে যুদ্ধকালীন একক নেতৃত্বের হাতে। যার কেন্দ্রে আছে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল।
ইরানি বিশ্লেষক আরাশ আজিজি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মোজতবার কাছে যায়। কিন্তু তিনি নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার অবস্থায় আছেন- এটা ভাবা এখন বেশ কঠিন। যারা যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি কীভাবে যাবেন?
পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত ইরানের সাবেক আলোচক সাঈদ জালিলিসহ কট্টরপন্থী কিছু নেতা যুদ্ধের সময় জোরালো বক্তব্য দিয়ে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তবে সিদ্ধান্ত বদলানো বা ফলাফল নির্ধারণ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা তাদের নেই। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো আরও জানায়, মোজতবা সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন আইআরজিসিরি সমর্থনে। সংস্কারবাদী অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তাঁকেই কঠোর নীতির রক্ষক হিসেবে মনে করেছে বাহিনীটি।
সান নিউজ/আরএ