ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ায় সেনাসদস্যদের মৃত্যু-পরবর্তী সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নতুন ধরনের প্রতারণার বিষয় সামনে এসেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম ও কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ব্ল্যাক উইডো’ নামে পরিচিত কিছু নারী সামরিক বাহিনীতে সদ্য যোগ দেওয়া বা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পুরুষদের বিয়ে করে তাঁদের মৃত্যুর পর সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ দাবি করছেন।
এ ধরনের একটি ঘটনার অভিযোগ তুলেছেন রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী মারিয়া। তাঁর দাবি, ৫৯ বছর বয়সী বাবা ইউরি গোপনে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মাত্র দুই দিন আগে বিয়ে করেন। পরিবারের কেউ বিষয়টি জানতেন না।
মারিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর পর সেনাবাহিনী থেকে তাঁকে জানানো হয়, ইউরির নতুন স্ত্রীই আইনগতভাবে তাঁর নিকটাত্মীয়। ফলে সরকার ঘোষিত মৃত্যু-পরবর্তী ক্ষতিপূরণের পুরো অর্থ ওই নারীই পাবেন। মারিয়ার দাবি, তিনি ওই নারীকে কখনো দেখেননি।
রাশিয়ায় যুদ্ধে নিহত একজন সেনাসদস্যের নিকটাত্মীয়কে অন্তত ৫০ লাখ রুবল ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক কোটি টাকার সমপরিমাণ। সেনাসদস্যদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য চালু করা এ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের একাধিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে দ্রুত বিয়ের অভিযোগ, আবার কোথাও মৃত্যুশয্যায় বিয়ে করার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত বছর একটি সামরিক হাসপাতালের এক নার্সের বিরুদ্ধে চিকিৎসাধীন কয়েকজন গুরুতর আহত সেনাসদস্যকে বিয়ে করার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
রাশিয়ার সংসদ সদস্য লিওনিদ স্লুতস্কি বলেছেন, যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাসদস্য ও তাঁদের পরিবারকে এ ধরনের আর্থিক প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর নতুন সেনাসদস্যদের বিয়ে করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় রুশ সরকার। বিয়ের বয়সসংক্রান্ত কিছু নিয়ম শিথিল করা হয় এবং গণবিয়ের আয়োজনও করা হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, কিছু প্রতারক চক্র এই সুযোগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।
গত বছর সাইবেরিয়ার টমস্ক শহরে ধারণ করা একটি ভিডিও পডকাস্টে এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট প্রকাশ্যে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে যাওয়া কোনো সেনাসদস্যকে বিয়ে করলে তাঁর মৃত্যুর পর পাওয়া ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব। ভিডিওটি প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ওই এজেন্ট ও অনুষ্ঠানের উপস্থাপককে কমিউনিটি সার্ভিসের দণ্ড দেওয়া হয় এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়।
এদিকে রুশ গণমাধ্যমের এক তদন্তে দাবি করা হয়েছে, দূরপ্রাচ্যের প্রিমোরস্কি ক্রাই অঞ্চলে কিছু সামরিক সদস্য অসহায় পুরুষদের বিয়ের ব্যবস্থা করে তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নিহত হলে পাওয়া ক্ষতিপূরণের অর্থ ভাগাভাগির উদ্দেশ্যেই এমন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। তবে এ বিষয়ে সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
মারিয়ার অভিযোগ, তাঁর বাবা শুধু মৃত্যু-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত প্রতারণার শিকারই হননি, নিজের অ্যাপার্টমেন্টও হারিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বাবার স্মৃতি ধরে রাখার মতো এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
সূত্র: সিএনএন
সান নিউজ/ হুমায়রা