মানুষের মৃত্যুর পর অস্বাভাবিক ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ময়নাতদন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রক্রিয়া। আইন অনুযায়ী এই সেবা সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন হওয়ার কথা এবং এর জন্য কোনো ফি নেওয়ার বিধান নেই। তবে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গকে ঘিরে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মর্গে আসা স্বজনদের কাছে গোসল, কাফন, কফিন এবং মরদেহ বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন সেবাকে একত্র করে একটি তথাকথিত ‘প্যাকেজ’ দেওয়া হয়। এই প্যাকেজের জন্য শুরুতে প্রায় ২০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে দরকষাকষির মাধ্যমে তা ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকায় নির্ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিন ভাইকে ঘিরে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ
মর্গ-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট চক্র পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সেকান্দার নামে এক সাবেক কর্মকর্তা, যিনি চাকরি থেকে অবসরে গেলেও এখনও মর্গ এলাকায় প্রভাব বজায় রেখেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
এছাড়া তার দুই ভাই বাবুল ও রামুও বর্তমানে সরকারি নিয়োগে কর্মরত। বাবুলের দায়িত্ব হাসপাতালের অফিস সহকারী হলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি অধিকাংশ সময় মর্গ এলাকায় অবস্থান করেন। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ বহিরাগত সদস্য মিলে স্বজনদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায় করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শোকের সঙ্গে যোগ হচ্ছে আর্থিক ভোগান্তি
প্রিয়জন হারানোর শোকের মধ্যেই মর্গে এসে বাড়তি অর্থের চাপের মুখে পড়ছেন অনেক পরিবার। অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই স্বজনদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, ফলে বাধ্য হয়েই তারা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং দ্রুত মরদেহ বুঝে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই অর্থ আদায় করা হয়।
ফরেনসিক বিভাগের বক্তব্য
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মমতাজ আরা জানান, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
তার ভাষ্য, ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল বা ফরেনসিক বিভাগ কোনো অর্থ গ্রহণ করে না। মরদেহ আনা-নেওয়া ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পুলিশের, আর ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্ব কেবল ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা।
মিটফোর্ড মেডিকেলেও একই ধরনের অভিযোগ
রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মর্গ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত এক কর্মচারীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে রাজি হননি। বরং সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
তদারকি বাড়ানোর দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ময়নাতদন্ত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিচারিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রক্রিয়া। এ ধরনের সেবায় অনিয়ম বা আর্থিক দুর্নীতি শুধু ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানির মুখে ফেলে না, বরং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি মর্গগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।