জাতীয়

প্রতিরক্ষা শুদ্ধাচার ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবার আহবান টিআইবির 

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিরক্ষা শুদ্ধাচার ব্যবস্থা ঢেলে সাজাবার জন্য আহবান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি প্রকাশিত জিডিআই সূচক ২০২০ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত দুর্নীতির অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি দেশের সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে সার্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও কাঠামোতে দুর্নীতির ঝুঁকি কতোটা, ঝুঁকি কমাতে কি ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নীতিকাঠামো ও চর্চা বিদ্যমান এবং সেগুলো কতোটা কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক এমন সব বিষয় বিবেচনা করে বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) বলছে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

মঙ্গলবার (১৬ নভেম্বর) গভর্নমেন্ট ইন্টিগ্রিটি ইনডেক্স বা সরকারি প্রতিরক্ষা শুদ্ধাচার সূচক ২০২০ প্রকাশ করে সংস্থাটি বলছে, প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ‘অতি দূর্বল’। ৮৬ দেশ নিয়ে প্রকাশিত এই সূচক অনুযায়ী ৬২ শতাংশ দেশেরই প্রতিরক্ষা খাত উচ্চ থেকে সংকটজনক দুর্নীতির ঝুঁকিতে রয়েছে।

৭৭ জিজ্ঞাসার বিপরীতে ২১২ নির্দেশকের ভিত্তিতে একটি দেশের প্রতিরক্ষা খাতের পাঁচটি ঝুঁকির ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করে জিডিআই ২০২০ সূচকটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই পাঁচটি ঝুঁকির ক্ষেত্র হল: রাজনৈতিক, আর্থিক, জনবল, পরিচালনা (operational) এবং ক্রয়। এসব ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রাপ্ত নম্বরকে (০ থেকে ১০০ স্কেলে) ‘এ’ থেকে ‘এফ’ শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ‘এ’ শ্রেণী হল সবচেয়ে কম ঝুঁকিসম্পন্ন এবং ‘এফ’ শ্রেণী হল সংকটজনক দুর্নীতির ঝুঁকিসম্পন্ন। সূচকের ফলাফল বলছে, ৮৫ স্কোর করে প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির সবচে কম ঝুঁকিতে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। এরপরেই রয়েছে যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে (স্কোর ৭৬), বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডের (স্কোর ৭৩)। আর ৫ স্কোর করে সর্বোচ্চ সংকটজনক দুর্নীতির ঝুঁকিতে রয়েছে সুদান। এরপরেই রয়েছে মিশর (স্কোর ৬), মিয়ানমার ও আলজেরিয়া (স্কোর ৮) এবং ইরাক (স্কোর ৯)। টিআই বলছে, জিডিআই সূচকে কম নম্বর পাওয়া দেশগুলোতে প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে থাকা সুরক্ষা পদ্ধতি বা কার্যক্রম- দূর্বল কিংবা অস্তিত্বহীন। বলা চলে, একইসাথে এসব দেশ অস্থিতিশীল, সংঘাতপূর্ণ কিংবা তার জনগণ শোষণের শিকার।

সার্বিকভাবে ২৫ স্কোর করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত এই সূচকে দুর্নীতির অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সূচকে বিচার্য পাঁচটি ঝুঁকি ক্ষেত্রের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি স্কোর করেছে সামরিক জনবল ব্যবস্থাপনায়- স্কোর ৫২। আর সবচেয়ে খারাপ স্কোর ০ (শূন্য) পেয়েছে পরিচালনা ঝুঁকির ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক ঝুঁকিতে স্কোর ২৬, আর্থিক ঝুঁকিতে স্কোর ১৯ আর সামরিক ক্রয়ে দুর্নীতির ঝুঁকিতে স্কোর ২৯।

সূচকে বাংলাদেশের এমন ফলাফলে উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই সূচক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি বিরাজ করছে, এমন কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ দিচ্ছে না। তবে খাতটিতে শুদ্ধাচার ঘাটতি ও দুর্নীতির ব্যাপক ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করেছে। অতএব সূচকের ফলাফলকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা শুদ্ধাচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং তার মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্নীতির প্রতিরোধক সক্ষমতা কাঠামো সুদৃঢ় করা অপরিহার্য।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে প্রথম ও অতিগুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ২০১০ এর ধারাবাহিকতায় একটি প্রতিরক্ষা শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন ও তার চর্চা করা উচিত। এক্ষেত্রে খসড়া প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের মতো সকল অংশীজনকে সম্পর্কিত করলে এর গ্রহণযোগ্যতা ও জাতীয় মালিকানাবোধ বাড়বে।’

জিডিআই এর ফলাফল বলছে, বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলোর পরিচালনা কার্যক্রম গোপনে পরিচালনার যে রীতি অনুসৃত হয়ে আসছে তা মোটেই সঠিক নয়। বরং গোপনীয়তা কোনোভাবেই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য প্রযোজ্য শর্ত নয়, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

যেমন: নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য জিডিআই সূচকে উচ্চ স্কোর করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, একটি দেশের সরকার যতো বেশি অংশগ্রহণমূলক এবং স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হয় সেখানে প্রতিরক্ষা খাত ততো বেশি স্বচ্ছ এবং দুর্নীতির ঝুঁকিও কম। একইভাবে জিডিআই স্কোর এর সাথে ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট রুল অব ল ইনডেক্সের তুলনা বলছে, যারা উন্মুক্ত সরকারের সূচকে ভালো ফলাফল করেছে তারা প্রতিরক্ষা খাতের স্বচ্ছতায়ও বেশি নম্বর পেয়েছে।

জিডিআই সূচকের বিশ্লেষণ বলছে, সামরিক বা প্রতিরক্ষা ব্যয়বৃদ্ধি এবং এখাতের দূর্বল শাসন বা ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত। এক্ষেত্রে জিডিপির ১ ভাগ সামরিক ব্যয়বৃদ্ধি মানে জিডিআই স্কোর ৫ পয়েন্ট কমে যাওয়া। এটি প্রমাণ করে যে, সামরিক ব্যয়বৃদ্ধি দূর্বল শাসনের ক্ষেত্রে হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ন উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখে। যেটি বিদ্যমান পরিস্থিতি, বিশেষ করে- শাসন ব্যবস্থার দূর্বলতাকে ব্যবহার করে দুর্নীতির সুযোগ বা ঝুঁকি তৈরি করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এটি খুবই হতাশাজনক যে বিশ্বে সামরিক ব্যয় এখন বার্ষিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দুর্নীতির মাত্রা ও ব্যাপকতাকে বাড়িয়ে চলেছে।

জিডিআই এর তথ্য বলছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্যের ৮৬ ভাগই হয়েছে সেইসব দেশ থেকে, যেসব দেশের প্রতিরক্ষা খাত মধ্যম থেকে উচ্চ দুর্নীতির ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৫৫), রাশিয়া (৩৬), ফ্রান্স (৫০), জার্মানি (৭০) এবং চীন (২৮)। এই পাঁচ দেশ বিশ্ব অস্ত্র বাণিজ্যের ৭৬ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে।

আবার বিশ্বের মোট অস্ত্র আমদানির ৪৯ শতাংশের গন্তব্যই ছিলো প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির ‘উচ্চ’ থেকে ‘সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশগুলোতে। এসব দেশে মূলত দেশটির আইনপ্রণেতা, নিরীক্ষক বা সুশীল সমাজের কারোই অস্ত্র বা সামরিক চুক্তির খুঁটিনাটি পরীক্ষার সুযোগ নেই বা দেয়া হয় না। এমনকি এই দেশগুলো কোনো ধরনের অর্থপূর্ণ তথ্যও প্রকাশ করে না- যার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব, কিভাবে তারা সুনির্দিষ্ট কোম্পানি থেকে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা এতে কোনো তৃতীয় পক্ষের যোগসূত্র রয়েছে কিনা।

দুর্নীতিবিরোধী প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণে অস্ত্রবাণিজ্য মূলত ঘুষ-দুর্নীতির অবারিত সুযোগ তৈরি করছে। এমনকি জনগণের অর্থ অপচয়ের মতো ঘটনার পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম সংঘবদ্ধ অপরাধী এবং উগ্রগোষ্ঠীর হাতে চলে যাবার ঝুঁকি তৈরি করছে।

জিডিআই এর তথ্য বলছে, সামরিক পরিচালনার দিক থেকে দুর্নীতির ঝুঁকির মাত্রা বৈশ্বিকভাবে খুবই উদ্বেগজনক। বেশিরভাগ দেশেরই খুবই স্বল্প দুর্নীতিবিরোধী প্রশিক্ষণ রয়েছে কিংবা মাঠ পর্যায়ে এসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ স্টাফ রয়েছে। এক্ষেত্রে সবগুলো দেশের গড় স্কোর মাত্র ১৬/১০০। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় নিযুক্ত বড় দেশ- যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর এই ক্ষেত্রে মাত্র ১৮, ফ্রান্সের ১০, আর বাংলাদেশের স্কোর ০ (শূন্য)।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারগুলো চাইলে খাতটিতে দুর্নীতির ঝুঁকি কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা- যেমন, স্বচ্ছতায় অগ্রাধিকার, দুর্নীতিবিরোধী কৌশল অবলম্বন ও প্রশিক্ষণ এবং নজরদারি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুশীল সমাজকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারে। যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ফলদায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

সান নিউজ/এনএএম

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

বোয়ালমারীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিদ্যালয়ের মালামাল বিক্রির অভিযোগ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গোহাইলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের টেন্ডারের বাইরে থা...

বিপ্লবের দুই বছর পরও স্বস্তি ফিরেনি সাধারণ মানুষের জীবনে: নাহিদ ইসলাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরে...

রামুতে অপহরণ মামলা, পারিবারিক বিরোধের অভিযোগ

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় একটি অপহরণ মামলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক...

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধ...

আল-আকসা দখলের পথে ইসরাইল

জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ও ডোম অব দ্য রক ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উ...

নদীদূষণ রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকাসহ দেশের নদীগুলোর দূষণ রোধে দ্রুত কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দ...

মুন্সীগঞ্জে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন 

মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাহাবুব আলম বাবুর বিরুদ্ধে দায়ের করা...

নিরাপদ অভিবাসনে প্রতারণার ঝুঁকি কমে: জেলা প্রশাসক নুরমহল আশরাফী

নিরাপদ, নিয়মিত ও বিধিসম্মত অভিবাসনের মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীদের প্রতারণার ঝুঁ...

বিএনপির সাংগঠনিক সভায় আ. লীগ নেতার শুভেচ্ছা নিয়ে বিতর্ক 

ঝালকাঠির সদর উপজেলার ৫ নম্বর কীর্তিপাশা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সভায় ইউনিয়ন প...

কুষ্টিয়ায় ক্যান্সার সচেতনতামূলক সেমিনার

কুষ্টিয়ার মিরপুরে ক্যান্সার সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে প্রা...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা