মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালের টেকনিশিয়ানের বিরুদ্ধে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতি শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের কাঁঠালতলা এলাকার তালুকদার ফার্মেসিতে বসে তিনি রোগী দেখেন বলে অভিযোগ। সরেজমিনেও নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে রোগী দেখার বিষয়টি দেখা গেছে।
রোগীপ্রতি ৫০ টাকা করে ফি নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত গাজী মো. মাসুদুর রহমান মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মানিকপুর এলাকার বেসরকারি ‘মানিকপুর ইসলামি চক্ষু হাসপাতাল’-এ টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত।
অভিযোগের বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে তার ব্যবহৃত ব্যবস্থাপত্রকে ঘিরে। একাধিক ব্যবস্থাপত্রে তার নামের আগে ‘ডা.’ ব্যবহার করে ‘ডা. গাজী মো. মাসুদুর রহমান’ পরিচয় লেখা রয়েছে। এসব ব্যবস্থাপত্রে চোখের বিভিন্ন সমস্যার ওষুধ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ডি.এম.এফ, ডিসপেনসিভ অপথালমিক (ডিও), ডি.অপথ, রিফ্র্যাকশন অ্যান্ড লো ভিশন কোর্সসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার কর্মক্ষেত্রের মূল দায়িত্ব চশমা ও লেন্স বিক্রি এবং চোখের অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরি সেবা দেওয়া। তবে হাসপাতালের বাইরে রোগী দেখা ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ঘটনায় তিনি চিকিৎসক হিসেবে আইনগতভাবে অনুমোদিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, চোখ শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ হওয়ায় এ ধরনের চিকিৎসায় চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন ও চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা সম্পর্কে রোগীদের নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। টেকনিশিয়ান চিকিৎসকের পরিচয়ে রোগী দেখলে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।
চিকিৎসা নিতে আসা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ লেখা থাকায় একজন রোগী স্বাভাবিকভাবেই তাকে চিকিৎসক মনে করবেন। তার কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর সন্দেহ তৈরি হলে পরে তিনি জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি চিকিৎসক নন, টেকনিশিয়ান। তার মতে, রোগীদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতি শনিবার নির্দিষ্ট সময়ে তালুকদার ফার্মেসিতে রোগী দেখলেও বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালের টেকনিশিয়ান কীভাবে নিয়মিত হাসপাতালের বাইরে রোগী দেখছেন এবং ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ পরিচয় ব্যবহার করছেন।
তালুকদার ফার্মেসির মালিক শাখাওয়াত হোসেন নিজাম বলেন, তিনি ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসক হিসেবেই জানতেন। চিকিৎসক না হলে ফার্মেসিতে তাকে বসতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। তবে তার কোনো সনদপত্র তিনি দেখেননি বলে স্বীকার করেন।
অভিযোগের বিষয়ে গাজী মো. মাসুদুর রহমান জানান, তিনি মানিকপুর ইসলামি চক্ষু হাসপাতালে টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত। ফার্মেসিতে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখার বিষয়টি তিনি স্বীকার করলেও চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখার বৈধতা বা ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে পারেননি।
মানিকপুর ইসলামি চক্ষু হাসপাতালের পরিচালক মো. মজিবুর সরকার বলেন, মাসুদুর রহমান প্রায় তিন বছর ধরে তাদের প্রতিষ্ঠানে টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত। তাকে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং হাসপাতালেও তিনি চিকিৎসক পরিচয় দেন না। হাসপাতালের বাইরে ‘ডা.’ পরিচয়ে রোগী দেখার বিষয়টি তার জানা নেই বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগটি তদন্ত করে ওই ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, চিকিৎসা দেওয়ার অনুমোদন, পেশাগত নিবন্ধন এবং ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ পরিচয় ব্যবহারের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত অবস্থায় হাসপাতালের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে রোগী দেখার অনুমতি তার রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগম বলেন, বিষয়টি আগে তার জানা ছিল না। এখন বিষয়টি অবগত হয়েছেন এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিকিৎসক না হয়ে কেউ ব্যবস্থাপত্র দিতে বা চিকিৎসাসেবা দিতে পারবেন না বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এতে চিকিৎসকের পরিচয় নিয়ে রোগীদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন তারা।
সান নিউজ/ রাব্বি