কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করা কিংবা অপমানজনক মন্তব্য করার পর অনেকেই বলে থাকেন, ‘আরে, মজা করছিলাম!’ কিন্তু হাসির ছলে বলা কোনো কথা কি সত্যিই অন্যের কষ্ট কমাতে পারে? মনোবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বলছে, সব ক্ষেত্রে তা নয়। বরং এমন মন্তব্য মানুষের আত্মসম্মান ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অন্যদের কাছেও অপমানজনক আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
মনোবিষয়ক সাময়িকী সাইকোলজি টুডে-তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, কারও পরিচয়, চেহারা কিংবা শারীরিক গঠন নিয়ে কটূক্তি করলে তার মধ্যে লজ্জা, হীনম্মন্যতা ও নিজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের চেহারা ও শরীর নিয়ে নিয়মিত বিদ্রূপ তাদের নিজেদের শারীরিক গঠন সম্পর্কে অসন্তুষ্টি বাড়াতে পারে।
অপমানের প্রভাব পড়ে আত্মসম্মানেও
কথার আঘাত কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করে কে কথাটি বলছেন, কী উদ্দেশ্যে বলছেন এবং যাকে বলা হচ্ছে, তিনি সেটিকে কীভাবে দেখছেন তার ওপর। বন্ধুদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া হাসি-ঠাট্টা আর কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে করা মন্তব্য এক নয়।
কোনো মন্তব্যকে একজন ব্যক্তি নিছক রসিকতা হিসেবে নিলেও অন্য কারও কাছে সেটি অপমানজনক মনে হতে পারে। তাই কেউ কষ্ট পাওয়ার কথা জানানোর পর ‘মজা করছিলাম’ বললেই তার অনুভূতি অগ্রাহ্য করা যায় না। বরং এমন পরিস্থিতিতে অপর ব্যক্তির অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
শৈশবে বারবার অপমানজনক কথা শোনার সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে প্রতিটি কটূক্তিই সরাসরি মানসিক অসুস্থতা সৃষ্টি করে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অপমানের ধরন, কতবার এমন ঘটনা ঘটছে এবং ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রভাবশালীদের আচরণ সমাজেও প্রভাব ফেলে
অপমানজনক কথার প্রভাব শুধু যিনি এর শিকার হন, তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আশপাশের মানুষও এমন আচরণ দেখে শিখতে পারে, কোন ধরনের কথা বা ব্যবহারকে সমাজে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়।
বিশেষ করে জনপ্রিয় ব্যক্তি, তারকা কিংবা ক্ষমতাবান কেউ প্রকাশ্যে অন্যকে হেয় করলে অনেকেই সেই আচরণকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারেন। ফলে বিদ্রূপ ও অবমাননাকর মন্তব্য ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানে এমন কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে, যেখানে হাস্যরসের আড়ালে প্রচলিত কুসংস্কার ও পক্ষপাত প্রকাশের বিষয়টি উঠে এসেছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিয়ে অপমানজনক মন্তব্যকে নিছক কৌতুক হিসেবে উপস্থাপন করা হলে অন্যরাও একই ধরনের আচরণে উৎসাহিত হতে পারেন।
তাই কোনো মন্তব্যে সবাই হাসছেন বলেই সেটি নিরীহ, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। হাসির পরিবেশ তৈরি হলেও সেই কথায় কেউ অপমানিত বা বিব্রত হচ্ছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সমালোচনা আর অপমানের মধ্যে পার্থক্য আছে
কারও ভুল ধরিয়ে দেওয়া কিংবা কোনো আচরণের সমালোচনা করা এবং ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ছোট করা এক বিষয় নয়। কোনো কাজের ভুল নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই ভুলের কারণে কাউকে অযোগ্য, অপদার্থ কিংবা হেয় করে কথা বলা ব্যক্তিগত অপমানের পর্যায়ে পড়তে পারে।
তাই কাউকে নিয়ে রসিকতা করার আগে ভাবা দরকার, কথাটি তাঁর মনে আঘাত করতে পারে কি না। আর কেউ কোনো মন্তব্যে কষ্ট পেয়েছেন জানালে, ‘মজা করছিলাম’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত, হাস্যরস মানুষের সম্পর্ককে সহজ ও আনন্দময় করতে পারে। তবে সেই হাসি যদি অন্যের আত্মসম্মানে আঘাত করে, তাহলে তার প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না। তাই কথার মাধ্যমে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখাও জরুরি।
সান নিউজ/ রাব্বি