যথাযথ ও প্রমাণযোগ্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং নিছক অনুমানের বশবর্তী হয়ে কাউকে ভারতীয় নাগরিকত্বহীন বা ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে দেশ থেকে বহিষ্কার করা বেআইনি বলে মন্তব্য করেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। সম্প্রতি মুর্শিদাবাদের এক বাসিন্দার আটকাদেশ ও বহিষ্কারের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি মামলার শুনান প্রুভিং প্রক্রিয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য।
মামলার প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ
মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি। মূলত কয়েকজন প্রতিবেশীর মৌখিক বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট সন্দেহের জেরে গত আগস্ট মাস থেকেই তাকে আটক করে রাখা হয়। পাশাপাশি ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) পক্ষ থেকে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কারের নোটিশ দেওয়া হয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে ওই ব্যক্তির স্ত্রী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই পরিবারের অংশ হওয়া সত্ত্বেও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়নি। মামলার শুনানিতে আবেদনকারীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম আদালতকে জানান যে, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই কেবল প্রতিবেশীদের আশঙ্কার ভিত্তিতে তাঁর মক্কেলকে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছে।
আদালতের কঠোর প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের বা তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কেন স্পষ্ট ও স্বচ্ছ আইনি পথ এড়িয়ে চলল? কেনই বা ওই ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হলো না? বিচারপতি আরও মন্তব্য করেন, শুধুমাত্র প্রতিবেশীদের দাবির ওপর ভরসা রেখে কীভাবে একজন মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব?
আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে বহু মানুষ বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে এই দেশে এসেছেন; তাই বলে কি সন্দেহের বশে বা ঢালাওভাবে তাদের সবাইকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো সম্ভব? কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব বা পরিচয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগে সরকারের উচিত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নথি যাচাই করা। কেবল জনস্রোতের কথায় বা অনুমাননির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে অনুপ্রবেশকারী সাব্যস্ত করা যায় না।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ও আইনি পদক্ষেপ
মামলায় রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট-জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে দাবি করেন যে, আটক ওই ব্যক্তি হয়তো ভুয়া পরিচয়পত্র বা জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগ্রহ করে থাকতে পারেন। উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বহিষ্কারের বিতর্কিত আদেশটি আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মামলাটি অধিকতর শুনানির জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যাতে এটি একটি উপযুক্ত ও নির্দিষ্ট বেঞ্চে স্থানান্তরিত হতে পারে।
ব্যাপক নাগরিক বিতর্ক ও প্রেক্ষাপট
আইনজীবীদের একাংশের মতে, হাইকোর্টের এই সময়োপযোগী পর্যবেক্ষণ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সামনে এল যখন ভারতে নাগরিকত্ব, নথিপত্র এবং ভোটাধিকার নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের নানা বিতর্কিত প্রক্রিয়ার জেরে বড় সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। বিরোধী দল এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের জোরালো অভিযোগ, বাংলাভাষী বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষকে টার্গেট করে বহু প্রকৃত নাগরিককে হেনস্তা করা হচ্ছে, যা তাদের মৌলিক অধিকার এবং কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
সান নিউজ / রাজীব