দশকের পর দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সামরিক জোটের লাগাতার বিমান হামলায় ইয়েমেনের মানচিত্র যেমন বদলে গেছে, তেমনই তছনছ হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের জীবন। একদিকে দেশীয় সরকার ও হুথিদের মধ্যকার সংঘাত, অন্যদিকে সৌদি জোটের ধ্বংসাত্মক হামলা এবং সর্বোপরি যুদ্ধক্ষেত্রের বহু দূরে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের লড়ে যাওয়ার করুণ এক চিত্র। যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাবারুদ আর বোমাবর্ষণের চেয়েও এখন তাদের কাছে পেটের ক্ষুধা ও চরম অর্থনৈতিক সংকট অনেক বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের থলিতে কমছে খাবার, বাড়ছে দুশ্চিন্তা
সরকারনিয়ন্ত্রিত দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী এডেনে এখন আর আগের মতো পণ্যের সংকট নেই, কিন্তু সমস্যা হলো সাধারণ মানুষের পকেটে পর্যাপ্ত টাকা নেই। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না খেটে খাওয়া মানুষের আয়। ফলে বাজারের ফর্দ থেকে একে একে বাদ পড়ছে মাছ, মাংস আর পুষ্টিকর খাবার। অনেকে বাধ্য হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম পরিমাণে চাল বা ডাল কিনছেন, কিংবা মাস শেষের আগেই ধারদেনা করতে নামছেন।
এডেনের এক সরকারি কর্মী বুশরা আব্দুলওয়ারিস। কালোবাজারের দর অনুযায়ী তিনি মাসে পান মাত্র ৭৮ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল, অথচ সেখানে একটি পরিবারের শুধু মৌলিক খাবারের খরচই লাগে এর প্রায় দ্বিগুণ। বাড়িভাড়া, যাতায়াত আর চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর মাসের বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটে, তা কেবল বুশরাদের মতো পরিবারগুলোই জানে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৫ সালের পর থেকে ইয়েমেনের মানুষের মাথাপিছু প্রকৃত আয় প্রায় ৫৮ শতাংশ কমে গেছে।
জীবন চলছে দিন এনে দিন খেয়ে
এডেনের একটি শপিং মলের কর্মী আয়মান আল-মাকতারি জানান, ক্রেতারা এখন আর প্রয়োজনের বাইরে কোনো জিনিস কিনতে আসেন না। তেল, চাল, আটার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দেখে তবেই ঝুড়িতে তোলেন। আগে যারা বড় বস্তায় চাল কিনতেন, তারা এখন ছোট প্যাকেটে ঝুঁকছেন। অনেক পরিবার এখন আর মাসজুড়ে পরিকল্পনা করতে পারে না, তাদের জীবন চলছে কেবল দিন কিংবা সপ্তাহ ধরে। এমনকি ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক রোগী ডাক্তারের পরামর্শের অর্ধেক ওষুধ কিনে কোনোমতে দিন পার করছেন।
মারিবের চিত্র ও বেতন বৃদ্ধির প্রহসন
রাজধানী সানার পূর্বে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন মারিব শহরেও একই চিত্র। এখানে যুদ্ধপীড়িত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সরকারি অফিসের অনেক কর্মী বেতন পাওয়ার প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই সব টাকা ঋণ শোধ করতে খরচ করে ফেলেন। সরকার সম্প্রতি জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সরকারি চাকরিজীবীদের ২০ শতাংশ ভাতা বাড়িয়েছিল, কিন্তু সাধারণ কর্মীরা বলছেন সাগরের মাঝে এক ফোঁটা জলের মতো এই সামান্য বৃদ্ধি জীবনযাত্রার মানের ওপর কোনো প্রভাবই ফেলেনি। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, সরকারনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবার তাদের মৌলিক খাবারের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকার অন্য রকম বাস্তবতা
অন্যদিকে, ২০১৪ সাল থেকে হুথিদের দখলে থাকা সানা ও উত্তরপশ্চিম অঞ্চলের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়। সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বেতন পান না। যদিও হুথি শাসিত এলাকায় মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল, কিন্তু মানুষের হাতে নগদ টাকা না থাকায় বাজারে তার কোনো সুফল মিলছে না। কাজ না থাকা, বিদেশি হামলা ও অবরোধের ফলে সৃষ্ট স্থবিরতা এবং ব্যাংক ব্যবস্থার চরম বিভক্তির কারণে সাধারণ মানুষ আজ কোণঠাসা। জীবন বাঁচাতে শেষ সম্বল বিক্রি করা কিংবা আত্মীয়স্বজনের পাঠানো সাহায্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া এই মুহূর্তে তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
সান নিউজ / রাজীব