সাভারের তেঁতুলাঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব বা ওয়ারিশ সনদের মতো গুরুত্বপূর্ন সেবা নিতে গিয়ে গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে বহিরাগতদের অবৈধ প্রবেশ ও খবরদারি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক সেবাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ইউনিয়ন পরিষদের কাজ পরিচালনার জন্য সচিব, গ্রাম পুলিশ ও অন্যান্য কর্মী থাকা সত্বেও ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সেখানে হস্তক্ষেপ করায় সেবা প্রত্যাশীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ইউনিয়ন পরিষদে ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব বা ওয়ারিশ সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোতে বহিরাগতদের প্রভাব বিস্তার করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দন্ডনীয় অপরাধ হলেও দালাল বা বহিরাগত ব্যক্তিরা মূলত অতিরিক্ত অর্থ আদায় (ঘুষ), কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং জালিয়াতির উদ্দেশ্যে এসব স্পর্শকাতর সেবায় হস্তক্ষেপ করছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের সময় দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা এক ব্যক্তিকে ঘিরে ধরেছে তিন যুবক। তার হাতে থাকা কাগজপত্র নিয়ে দেখে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাচ্ছে ওই যুবকেরা। পরিষদের সচিবের কক্ষের সামনে এবং ভিতরে সেবা প্রত্যাশীদের প্রচুর ভিড় থাকা সত্বেও ওই যুবকদেরকে বিভিন্ন লোকজনের কাগজপত্র হাতে নিয়ে কথা বলতে দেখা গেলো।
কাগজপত্র দেখার কারন জানতে চাইলে নিজেকে ছাত্রদল কর্মী দাবি করে জনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আমাদের ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মোঃ শামীম আহমেদকে এই পরিষদটি দেখে রাখার দায়িত্ব দিয়েছে আমরা শামীম আহমেদের হয়ে এখানে সেবা প্রত্যাশীদের সহযোগীতা করছি।
তবে বেশ কয়েকজন সেবা প্রত্যাশীর সাথে কথা বলে তার উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে। মূলত এই ছাত্রদল কর্মীরা বিভিন্ন জনকে সেবা দিচ্ছেন নিজেদের লাভের জন্য। এতে করে কাউকে আগে কাজ করিয়ে দেয়ায় অন্যরা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন।
সেবা প্রত্যাশীরা অভিযোগ করেন, সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের হাতের কাগজ দেখে তাদের সমস্যার কথা শুনে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করেন কয়েকজন যুবক। টাকা হলে তারা দ্রুত কাজ করে দেয়ার আশ্বাস দেয়। আর তাদের দিয়ে কাজ না করালে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন শিল্প কারখানার ট্রেড লাইসেন্স নিতে আসা গ্রাহকদের টাকা কমিয়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে ওই যুবকদের বিরুদ্ধে। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, অন্যদিকে টাকার বিনিময়ে যারা সেবা নিতে পারছেন তাদের ভোগান্তি চরমে পৌছেছে।
স্থানীয় শাপলা হাউজিং থেকে ভোটার হওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যয়নপত্র নিতে আসা শাহিদা বেগম বলেন, আমি ভোটার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র জমা দিয়েছি তবুও আমার কাজটা হচ্ছেনা। কয়েকজন যুবক আমাকে ডেকে নিয়ে সমস্যার বিষয়টি শুনে ২০ হাজার টাকা দিলে দ্রুত প্রত্যয়নপত্র প্রদানসহ সবকাজ করে দিবে বলে জানায়। কিন্তু আমার কাছে এতো টাকা না থাকায় আমি দুই হাজার টাকা দিতে চাইলেও তারা কাজটি করে দিতে রাজি হয়নি।
অপর সেবাপ্রার্থী ইউনিয়নটির মেইটকা গ্রামের বাসিন্দা লিয়কত আলীর অভিযোগ, তার বাবা মারা যাওয়ায় ওয়ারিশ সার্টিফেট নেয়ার জন্য পরিষদে এসেছেন। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে টাকা দাবি করেছে তা দিতে না পারায় আমার কাজটি হচ্ছেনা। বিষয়টি ছাত্রদল নেতকর্মীদের জানালে টাকা হলে তারা দ্রুত কাজ করে দেয়ার কথা জানায়।
সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে সহায়তা প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মোঃ শামীম আহমেদ বলেন, আমরা কারও কাছ থেকে টাকা নিয়েছি কেউ বলতে পারবেনা। উল্টো এখানে যে দালাল চক্রের সদস্যরা টাকা নিয়ে সেবা দিতো তাদেরকে আমরা এখান থেকে বের করে দিয়েছি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও দুর্নীতি রোধে পরিষদে বহিরাগতদের উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকার পরও কিভাবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি ফাইল পরিচালনা ও খবরদারি করছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোঃ আনিছুর রহমান বলেন, এখন থেকে আমিই সবকিছু দেখবো। যাতে গ্রাহকদের ভোগান্তি না হয় এবং বহিরাগতরা খবরদারি করতে না পারে সেজন্য আগামীকাল থেকে সবকিছু আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এরপরই তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি শামীম আহমেদ ও সম্পাদককে কাল থেকে তার সাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
সান নিউজ/ জামান