আইনি জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের ৩০৪টি আমদানিকৃত গাড়ি। আদালতে একাধিক রিট বিচারাধীন থাকায় এসব গাড়ি নিলামে বিক্রি কিংবা স্ক্র্যাপ—কোনোটিই করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন মূল্যবান যানবাহন ধীরে ধীরে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে নতুন আমদানি হওয়া গাড়ি সংরক্ষণেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিক বহুতল কারশেড ঘুরে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে অযত্নে পড়ে থাকা গাড়িগুলো ধুলাবালিতে ঢেকে গেছে। অনেক গাড়ির টায়ার নষ্ট হয়ে মেঝেতে বসে গেছে, আবার অনেকগুলোর ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেখতে যেন একটি পরিত্যক্ত যানবাহনের ডাম্পিং ইয়ার্ড।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, দুটি কারশেডে মোট ১ হাজার ২৫০টি গাড়ি রাখার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে ৬০৩টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ৩০৪টি ইতোমধ্যে চলাচলের অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ জানান, এসব গাড়ির অনেকগুলো ১০ থেকে ১৫ বছর আগে আমদানি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে জায়গা দখল করে থাকায় নতুন আমদানিকৃত গাড়ি আধুনিক কারশেডে রাখার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক নতুন গাড়ি খোলা জায়গায় সংরক্ষণ করতে হচ্ছে, যা সেগুলোর গুণগত মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর আগে বিআরটিএ ১৮২টি গাড়িকে সম্পূর্ণ অচল ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৭৪টি গাড়ি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হলেও অবশিষ্ট ১০৮টি গাড়ির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট থাকায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। এছাড়া আরও ৮৭টি গাড়ি সম্পর্কিত পৃথক রিটও বিচারাধীন রয়েছে। এসব চালানের অনেক গাড়িই ১৫ থেকে ২০ বছর আগে দেশে আমদানি করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, আদালতে মামলা বা রিট চলমান থাকলে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গাড়ি নিলাম বা ধ্বংস করা যায় না। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা এসব গাড়ির প্রতিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে বন্দরে পড়ে থাকা গাড়িগুলোর সম্মিলিত মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও এসব গাড়ির আমদানি বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা অনেক আগেই বিদেশে পরিশোধ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন বন্দরে যানবাহন পড়ে থাকার কারণে যেমন সম্পদের অপচয় হচ্ছে, তেমনি বন্দরের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। তাই দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে গাড়িগুলো বিক্রি অথবা প্রয়োজন হলে স্ক্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
পিএইচপি অটোমোবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকতার পারভেজ বলেন, আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে টেন্ডারের মাধ্যমে গাড়িগুলো হস্তান্তর করা হলে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার বা স্ক্র্যাপ করতে পারবেন। বিকল্পভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও নিজ উদ্যোগে স্ক্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করতে পারে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বিদেশ থেকে আমদানি করা গাড়ি ৩০ দিনের মধ্যে খালাস করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস না হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ গাড়িগুলো কাস্টমস হাউজের কাছে নিলামের জন্য হস্তান্তর করে। তবে আইনি জটিলতার কারণে এই ৩০৪টি গাড়ির ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়াও থমকে আছে।
ফলে বন্দরের মূল্যবান জায়গা বছরের পর বছর ধরে অচল গাড়ির দখলে থাকছে। এতে নতুন আমদানিকৃত গাড়ির সংরক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আমদানি কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে চাপ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি এবং কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।