দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক সংকট দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। আদালতে চলমান একাধিক মামলা এবং পাল্টা মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম আটকে রয়েছে। এর ফলে দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়েই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা শিক্ষার মান ও ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ছাড়াও সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এতে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় শিক্ষকরা
অনেক অভিজ্ঞ সহকারী শিক্ষক দীর্ঘ সময় চাকরি করেও পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন না। দায়িত্ব পালন করলেও তারা এখনো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরিচয় বহন করছেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ, পদোন্নতির জন্য যোগ্যতা অর্জনের পরও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাদের ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়েছে।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করলেও প্রধান শিক্ষক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় কর্মক্ষেত্রে হতাশা বাড়ছে।
২০১৯ সালের পর থেকেই স্থবির নিয়োগ কার্যক্রম
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৯ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলার পর থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে একের পর এক আইনি জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া আর স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারেনি।
এর প্রভাব বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
মাধ্যমিক শিক্ষাতেও একই চিত্র
প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতেও নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিওভুক্তি, জাল সনদসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাজার হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার কারণে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বৈধতা নিয়ে মামলা চলায় বছরের পর বছর পদটি শূন্য রয়েছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ভোগান্তি বাড়ছে।
বিশেষ বেঞ্চ গঠনের দাবি
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন। একই ধরনের মামলার একসঙ্গে শুনানি হলে বহু দীর্ঘদিনের জট একসঙ্গে নিরসন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
সরকারও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি বিচার বিভাগের বিবেচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
শিক্ষাবিদদের মতে, অনেক মামলা প্রকৃত অধিকার আদায়ের চেয়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক বিরোধ কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে দায়ের করা হয়। এসব কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় আটকে থাকে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।
তাদের মতে, শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মামলা নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব
প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক তদারকি, একাডেমিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপও বাড়ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে দ্রুত আইনি জট কাটিয়ে শূন্য পদগুলোতে নিয়মিত নিয়োগ সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।