২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ করদাতাদের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু সিদ্ধান্তে সংশোধন এনে করপোরেট কর হ্রাস, ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ জুন জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত বাজেট পাসের সময় এসব সংশোধনী যুক্ত হতে পারে।
শর্তসাপেক্ষে কমতে পারে করপোরেট কর
চূড়ান্ত বাজেটে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল, এখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন করহার কার্যকর রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য করের বোঝা কমবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংক হিসাব খুলতে আর লাগবে না ই-টিআইএন
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থাকলেও ব্যাপক আলোচনা ও মতামতের পর সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বর্ণ বিক্রির গেইন ট্যাক্স কমে হতে পারে ৫ শতাংশ
স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স কমিয়ে ৫ শতাংশ করার চিন্তা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কর ফাইলে অস্বাভাবিক পরিমাণ স্বর্ণ দেখিয়ে অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতেই নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হচ্ছে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হলে করদাতার ঘোষিত স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত মূলধনি মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমার সম্ভাবনা
চূড়ান্ত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
সরকারের ধারণা, করের চাপ কমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো ও শিক্ষার মান উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা
মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থবছরগুলোতে ধাপে ধাপে এই সীমা আরও বাড়ানোর বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে কর রেয়াতের সীমা এবং উৎসে করের হিসাবের কিছু পরিবর্তনের কারণে সামগ্রিক করের বোঝা আগের মতোই থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভ্যাট নীতিতেও আসতে পারে পরিবর্তন
খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ীদের সমালোচনার পর সরকার সেই অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মাসিকের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হতে পারে, যা ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ করবে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেটের লক্ষ্য
সংশ্লিষ্টদের মতে, চূড়ান্ত বাজেটে প্রস্তাবিত এসব পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে, ব্যবসায়ীদের করের চাপ কিছুটা কমবে এবং সাধারণ করদাতারাও কিছুটা স্বস্তি পাবেন। পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া নীতিগত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।