বাংলাদেশে শিশুদের জন্য পরিচালিত জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের সরবরাহ না থাকায় নিয়মিত এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, ফলে শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সাধারণত বছরে দুইবার পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। তবে সর্বশেষ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চে। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চে নির্ধারিত দুটি ক্যাম্পেইন আয়োজন করা যায়নি।
ক্যাপসুল সরবরাহে বিলম্ব, অপেক্ষায় স্বাস্থ্য বিভাগ
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল আমদানির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় কর্মসূচি পিছিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ক্যাপসুল দেশে পৌঁছালে মাসের শেষ দিকে জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করা সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সরবরাহ হাতে পেলেই দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বছরে আড়াই কোটির বেশি শিশু পায় ভিটামিন-এ
বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশুকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের জন্য নির্ধারিত থাকে নীল রঙের ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের দেওয়া হয় লাল রঙের ক্যাপসুল।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কেন দেখা দিল সংকট?
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার প্রথমবারের মতো ইউনিসেফের মাধ্যমে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পূর্বে দরপত্রের মাধ্যমে ক্যাপসুল কেনা হলেও নতুন ক্রয়পদ্ধতিতে রূপান্তরের কারণে সরবরাহে সময় লেগেছে।
এ ব্যবস্থায় একটি ধাপের ক্যাপসুল ক্রয় করলে আরেক ধাপের সরবরাহ সহায়তা হিসেবে পাওয়ার সুযোগ থাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইউনিসেফের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
শিশুদের জন্য ভিটামিন-এ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন-এ শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ সময় এ কর্মসূচি বন্ধ থাকলে অপুষ্টি, হাম, ডায়রিয়া এবং বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতীতে রাতকানা রোগ নিয়ন্ত্রণে ভিটামিন-এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বর্তমানে এ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
জাতীয় পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ভিটামিন-এ ঘাটতিতে ভুগছে। একইসঙ্গে নারীদের মধ্যেও এ ঘাটতির উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, অপুষ্টি মোকাবিলা এবং শিশুদের সংক্রমণজনিত রোগ থেকে সুরক্ষায় ভিটামিন-এ অত্যন্ত কার্যকর একটি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট।
ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের প্রধান উপকারিতা
- দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
- হাম, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
- শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক বিকাশে ভূমিকা রাখে।
- ত্বক ও শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
- অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
কৃমিনাশক ওষুধেও গুরুত্ব
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভিটামিন-এ কর্মসূচির পাশাপাশি শিশুদের নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, কৃমির কারণে শিশুদের শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যা অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেশে পৌঁছালে জুনের শেষ সপ্তাহেই জাতীয় কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা