খুলনা মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খুন, গুলিবর্ষণ এবং অন্যান্য সহিংস অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবার হারানোর বেদনা ও স্বজনদের কান্না যেন অনেক এলাকায় পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।
আলোচিত একাধিক হত্যাকাণ্ড
চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে খুলনায় বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যার ঘটনা ঘটে। মার্চ মাসে নগরীর ডাকবাংলো মোড় এলাকায় একটি জুতার দোকানে ঢুকে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জুনে দৌলতপুরে ফজরের নামাজ শেষে একটি মসজিদের ভেতরে দুই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ছাড়া পারিবারিক বিরোধের জেরে একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা এবং সম্প্রতি এক সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার ঘটনাও নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় লাশ উদ্ধার, অস্ত্র প্রদর্শন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধও নিয়মিত ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছয় মাসে ৪৩ জন নিহত
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় মোট ৪৩ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন হত্যা মামলায় ১৭টি মামলার সূত্র ধরে ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া মাদকবিরোধী অভিযানে ২৫৭টি মামলায় ৩৫৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
কী কারণে বাড়ছে অপরাধ?
আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, জমি ও ব্যবসা-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, পারিবারিক কলহ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা—এসব কারণ সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে রাত পর্যন্ত বাইরে চলাফেরা করতে তেমন ভয় লাগত না। এখন পরিবারের সদস্যরা বাইরে থাকলে উদ্বেগ কাজ করে। ব্যবসায়ীরাও রাতের বেলায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। অনেকেই পুলিশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের পরামর্শ
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযানে গ্রেপ্তার বাড়ালেই দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমবে না। অপরাধের মূল উৎস চিহ্নিত করে মাদক সিন্ডিকেট, অবৈধ অস্ত্র সরবরাহকারী চক্র এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধে জড়ানোর প্রবণতাও কমতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য
খুলনা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা কিছুটা কমেছে। প্রতিটি হত্যার ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
অন্যদিকে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার সত্ত্বেও সহিংসতা পুরোপুরি কমছে না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কৌশল, আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক তদারকি এবং দ্রুত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করাই খুলনায় স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কার্যকর পথ হতে পারে।