ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় সাবেক সেনাপ্রধান প্রাবোও সুবিয়ান্তোর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার এই বিশেষ দিনে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদকাল দু’বছর ছুঁইছুঁই করার এই মুহূর্তটিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষায় বর্তমান নেতার জনসমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার পরপরই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নতুন করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। জাকার্তা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধ করতে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজপথে সাড়ে নয় হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
শেয়ার বাজারের ধস, দাবানল ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি : জাকার্তা পুলিশের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নিশ্চিত করেছেন যে, অন্তত দুটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছেন। দেশের ঐতিহ্যবাহী ইউনিভার্সিটি অব ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষার্থীরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ দাবানলের প্রকোপ এবং শেয়ার মার্কেটে লাগাতার পতনের প্রতিবাদে তারা রাজপথে নামছেন। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিমত হলো—পুঁজিবাজারের এই ধস এবং জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন মূলত দেশীয় অর্থনীতির ভঙ্গুর ও দুর্বল কাঠামোরই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
যদিও এই বিক্ষোভ মিছিলে ঠিক কত সংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে শিক্ষাঙ্গনের পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ক্রমেই সোচ্চার হয়ে উঠছে।
এর অংশ হিসেবে দেশের অন্যতম প্রধান পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিস’-এর কর্মীরা জাকার্তার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে বিশাল আকৃতির একটি প্রতিবাদী ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ওই ব্যানারে বর্তমান প্রশাসনের উদ্দেশে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, অবিলম্বে জলবায়ু সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।
জনপ্রিয়তার দ্রুত পতন ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সংশয় : ২০২৪ সালের ঠিক এই দিনে অর্থাৎ ২০ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার অষ্টম প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয় শপথ গ্রহণ করেছিলেন প্রাবোও সুবিয়ান্তো। সশস্ত্র বাহিনীর এই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বিগত জাতীয় নির্বাচনে বেশ বড় ধরনের ব্যবধানে এবং নিরঙ্কুশ জনসমর্থন নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন।
তবে গত দুই বছরের কার্যকাল শেষে বর্তমানে তাকে সাধারণ জনগণ, শীর্ষ ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আস্থা অর্জনের জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তার বহুচর্চিত উচ্চাভিলাষী এবং জনতুষ্টিবাদী বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কারের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এখন শুধু রাজনৈতিক বিরোধীরাই নন, বরং খোদ তার নিজ দল ও জোটের সমর্থকরাও গভীর দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন গবেষণা ও জরিপ প্রতিষ্ঠান ‘সাইফুল মুজানি রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিং’ (এসএমআরসি)-এর সদ্য প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের শেষ প্রান্তিক থেকেই প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর জনপ্রিয়তার গ্রাফ ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে।
গত বছরের নভেম্বরের দিকে যেখানে তার কাজের অনুমোদনের হার ছিল আকাশচুম্বী প্রায় ৮১ শতাংশের ওপরে, সেখানে সাম্প্রতিক অক্টোবরের জরিপে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে মাত্র সাড়ে চুয়াল্লিশ শতাংশে ঠেকেছে। বর্তমান প্রশাসনের পুরো মেয়াদে এটিই তাঁর সর্বনিম্ন জনসমর্থনের রেকর্ড।
উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসেও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বেশ বড় ধরনের নাগরিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছিল, যে সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে কয়েকশ মানুষকে কারাবন্দি করা হয়েছিল। এছাড়া পূর্ববর্তী বছরগুলোতেও ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে এক মোটরচালকের মর্মান্তিক মৃত্যুর জেরে পুরো ইন্দোনেশিয়াজুড়ে তীব্র গণরোষ ছড়িয়ে পড়েছিল। তৎকালীন সেই রক্তক্ষয়ী ও উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি মাথায় রেখেই বর্তমান সরকার সম্ভাব্য যে কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
সান নিউজ / রাজীব