মুম্বাইয়ের অভিজাত জুহু এলাকায় অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সালমান খান ও গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের দলের দীর্ঘদিনের বিরোধ। রোববার পুষ্পা নার্সারি পার্কের বাইরে এ ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরই মধ্যে গ্যাংস্টার অনিল পণ্ডিতের একটি অডিও রেকর্ডিং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অস্পষ্ট কণ্ঠে সেখানে বলতে শোনা যায়, ‘সালমান খানকে ক্ষমা চাইতে হবে।’ হামলার দায়ও তিনি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
সালমান খানকে ঘিরে এই বিরোধের শিকড় প্রায় তিন দশক আগের। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে বন্য প্রাণী শিকারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেই ঘটনা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯৮ সালের শিকার মামলা
১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে যোধপুরে সিনেমার শুটিংয়ের সময় সালমান খানের বিরুদ্ধে একাধিকবার হরিণ শিকারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বরের রাতে ভাবাদ গ্রামে দুটি চিঙ্কারা হরিণ শিকার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া চলে। পরে সংশ্লিষ্ট মামলায় রাজস্থান হাইকোর্ট তাকে খালাস দেন।
এরপর ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বরের রাতে লুনির ঘোড়া ফার্ম এলাকায় আরও দুটি চিঙ্কারা শিকারের অভিযোগ ওঠে। ওই মামলাতেও সালমান খালাস পান। তবে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের মামলা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১ ও ২ অক্টোবরের রাতে কানকানি গ্রামে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ২০১৮ সালে বিচারিক আদালত সালমান খানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তার আপিল বিচারাধীন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই সময় সিনেমার অন্য অভিনয়শিল্পী নীলম, তাবু, সোনালি বেন্দ্রে ও সইফ আলি খানের নামও মামলায় আসে। তবে বিচারিক আদালত তাদের খালাস দেন। সেই খালাসের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিলও বিচারাধীন রয়েছে।
কেন ক্ষুব্ধ বিষ্ণোই সম্প্রদায়?
বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে প্রকৃতি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের ধর্মীয় বিধানে প্রাণী, পাখি ও পরিবেশ রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণসার হরিণকে তারা অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
এ কারণে সালমান খানের বিরুদ্ধে হরিণ শিকারের অভিযোগ সম্প্রদায়টির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাদের অনেকে মনে করেন, একজন জনপ্রিয় তারকার বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগের যথাযথ বিচার হওয়া জরুরি।
কানকানি গ্রামের ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা তদন্তে সহযোগিতা করেন এবং আদালতে সাক্ষ্য দেন। পরবর্তী দুই দশক ধরে মামলাটির অগ্রগতির দিকে নজর রাখেন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সদস্যরা। আদালত, থানা ও বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রতিবাদও এ ঘটনাকে আলোচনায় রাখে।
সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন মামলাটি পরিচালনায় যুক্ত আইনজীবী মহীপাল বিষ্ণোই বলেন, সম্প্রদায়ের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে মামলাটি অনুসরণ না করলে বিচারপ্রক্রিয়া এত দূর এগোত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকত। তার মতে, কৃষ্ণসার শিকারের মামলায় সালমানের দণ্ডাদেশ সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।
কীভাবে বিরোধে জড়িয়ে পড়লেন লরেন্স বিষ্ণোই?
সালমান খানকে ঘিরে এই বিরোধে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম সামনে আসে আরও পরে। ২০১৮ সালে যোধপুরের একটি আদালতে অন্য মামলায় হাজিরার পর তিনি গণমাধ্যমের সামনে সালমান খানকে হত্যার হুমকি দেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় তিনি বলেছিলেন, সালমানকে যোধপুরেই হত্যা করা হবে, যাতে তিনি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অবস্থান বুঝতে পারেন। এই বক্তব্যের পর লরেন্স বিষ্ণোই জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি পান।
১৯৯৮ সালে শিকারের অভিযোগ ওঠার সময় লরেন্স ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পরবর্তী সময়ে তিনি অপরাধজগতের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। বিশ্লেষকদের মতে, সালমান খানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজের পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে কোনো অপরাধের পেছনে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
প্রচারের আড়ালে চাঁদাবাজির উদ্দেশ্য?
রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্সের প্রধান এম এন দীনেশের মতে, তারকাদের ঘিরে আলোচিত ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রগুলো নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে তাদের প্রভাব বিস্তার এবং চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, এ ধরনের অপরাধী চক্র অনেক সময় ভাড়াটে শুটার ব্যবহার করে। হামলার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে বা শুটার ধরা পড়লে অন্য সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে। রাজস্থানে একাধিক ভাড়াটে হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করার কথাও জানান তিনি।
দীনেশের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধী চক্রগুলোর লক্ষ্য সব সময় শুধু আলোচিত ব্যক্তিকে আক্রমণ করা নয়; বরং ভয় সৃষ্টি করে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করাও এর অংশ হতে পারে।
সালমানের শাস্তি নয়, আইনি বিচার চান বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের একাংশ
বিষ্ণোই টাইগার ফোর্সের সাধারণ সম্পাদক রাম নিবাস বিষ্ণোইয়ের মতে, সালমান খানের শিকার মামলা সম্প্রদায়টির কাছে আবেগের বিষয়। তার দাবি, মামলার সব আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি এবং তারা চূড়ান্ত বিচার দেখতে চান।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সম্প্রদায় সালমানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চায়, তার মৃত্যু নয়। তার ভাষায়, বিষ্ণোই সম্প্রদায় গাছপালা, প্রাণী ও পাখি রক্ষায় বিশ্বাসী এবং অহিংসাকে গুরুত্ব দেয়। তাই সহিংসতার আহ্বান জানানো তাদের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সালমান খানের আদালতে হাজিরার সময় যোধপুরে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথাও জানান রাম নিবাস। মামলার শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এখন সরাসরি আদালতে উপস্থিতির প্রয়োজন কমে যাওয়ায় উত্তেজনাও কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যোধপুর জেলা বিষ্ণোই মহাসভার সভাপতি নারায়ণ রাম বিষ্ণোইও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি সম্প্রদায়ের বিরোধিতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তারা গণমাধ্যমের খবরের ওপর নির্ভর করেন। কোনো অপরাধমূলক বা অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডকে সম্প্রদায় হিসেবে সমর্থন করা সম্ভব নয়।
ক্ষমা চাওয়া নিয়েও মতভেদ
অখিল ভারতীয় বিষ্ণোই মহাসভার দেবেন্দ্র বুধিয়া মনে করেন, সালমান খান বিকানেরের মুক্তি ধামে গিয়ে গুরু জম্ভেশ্বরের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে হরিণ শিকারের জন্য ক্ষমা চাইলে বিরোধের অবসানের পথ তৈরি হতে পারে। গুরু জম্ভেশ্বর বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।
তার এই বক্তব্যে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের আগের দাবির প্রতিফলন দেখা যায়। তবে সম্প্রদায়ের অন্য নেতারা সহিংসতার বিরোধিতা করে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ১৯৯৮ সালের হরিণ শিকার মামলা শুধু একটি আইনি বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ এবং সালমান খানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, এই বিরোধকে ব্যবহার করে অপরাধী চক্র নিজেদের পরিচিতি বাড়াচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনার সঙ্গে সালমান খান বা লরেন্স বিষ্ণোইয়ের দলের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তবে ঘটনাটি পুরোনো বিরোধ এবং তার পেছনের সাংস্কৃতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সান নিউজ/ রাব্বি