ফরাসি রাজধানীর রাজপথে যখন নাগরিক বিক্ষোভ, তীব্র সহিংসতা এবং ভাঙচুরের দাবানল বইছে, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তেও ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে ছেদ পড়ছে না। দেশজুড়ে চরম অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করা সত্ত্বেও নির্ধারিত সূচি মেনেই মাঠে গড়াতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় দ্বৈরথ—প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) এবং বার্সেলোনার মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচটি।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আজ মঙ্গলবারের এই মেগা ম্যাচটি রাজধানীর পার্ক দে প্রিন্সেস স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে পুরো স্টেডিয়াম চত্বরে মোতায়েন করা হবে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তাবলয়।
গত কদিন ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রান্তে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে উগ্র রূপ নেয়। দোকানপাটে নির্বিচার লুটপাট, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
পিএসজি ও এফসি বার্সেলোনার ম্যাচটি পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই মাঠে গড়াবে এবং এর ওপর কোনো স্থগিতাদেশ আসছে না।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলায় ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার নতুন করে দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা রোধ করতে দেশের সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে স্থানীয়ভাবে আংশিক কারফিউ জারির নির্দেশ দেন। টানা বেশ কিছুদিন ধরে চলা ছাত্র বিক্ষোভ সামলাতে গিয়ে ফরাসি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন আগে থেকেই চরম চাপের মুখে রয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এমন একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ সফলভাবে সম্পন্ন করা প্রশাসনের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের মে মাসে পিএসজির দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের আনন্দ উৎসবও সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল। সে সময় প্যারিসের রাজপথে বেশ কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার জেরে পুলিশ ডজন ডজন মানুষকে আটক করতে বাধ্য হয় এবং অতিউৎসাহী একদল জনতা একটি পুলিশ স্টেশনে জোরপূর্বক ঢোকারও চেষ্টা চালিয়েছিল।
এহেন অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানের দাঙ্গাবাজ পরিস্থিতির কারণে সরকারি উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। দেশের পূর্বনির্ধারিত সব বড় জমায়েত ও সাংস্কৃতিক বা ক্রীড়া ইভেন্ট স্থগিত বা বাতিল করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত পিএসজি বনাম বার্সেলোনার ম্যাচটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে প্রশাসন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জরুরি বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, পিএসজি ও এফসি বার্সেলোনার ম্যাচটি পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই মাঠে গড়াবে এবং এর ওপর কোনো স্থগিতাদেশ আসছে না। কেবল এই ম্যাচটিই নয়, চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যান্য প্রতিযোগিতাও নির্ধারিত ফিক্সচার অনুযায়ীই পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দলের খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না—এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পিএসজির স্প্যানিশ কোচ লুইস এনরিকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এসব নেতিবাচক ঘটনা তাদের মূল লক্ষ্য থেকে এক বিন্দুও দূরে সরাতে পারবে না। যদিও সমাজে চলমান এই ধরনের সহিংসতার ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তবুও তিনি মনে করেন বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ ফুটবলের মাঠেই নিবদ্ধ রাখা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে এনরিকে বলেন, দেশের চলমান সামাজিক সংকট নিয়ে মন্তব্য করার মতো সঠিক ব্যক্তি তিনি নন, তিনি এখানে এসেছেন কেবল ফুটবল নিয়ে কথা বলতে। সহিংসতার ঘটনা কারও জন্যই কাম্য নয় স্বীকার করে এই ফরাসি কোচ দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি দূরে সরিয়ে রেখে খেলোয়াড়দের কেবল ম্যাচের সুনির্দিষ্ট কৌশলের দিকেই শতভাগ মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। সব শঙ্কা ও নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্য দিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা এখন একটি রোমাঞ্চকর রাতের অপেক্ষায় দিন গুণছেন।
সান নিউজ / রাজীব