যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভেবে ভুল করে প্রতিবেশীর বাসায় ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দণ্ডিত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অ্যাম্বার গাইগার প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন। ১০ বছরের কারাদণ্ডের মধ্যে সাত বছর কারাভোগের পর শুক্রবার মুক্তি পান তিনি। বাকি সাজা কারাগারের বাইরে শর্তসাপেক্ষে কাটাতে হবে তাকে।
২০১৮ সালে ২৬ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ যুবক বোথাম জিনকে হত্যার দায়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে গাইগারকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। ওই সময় তার বয়স ছিল ৩১ বছর। বর্তমানে ৩৮ বছর বয়সী গাইগার টেক্সাসের গেটসভিলের ক্রিস্টিনা মেলটন ক্রেইন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
বোথাম জিনের পরিবারের আইনজীবী লি মেরিট জানিয়েছেন, গাইগারের আগাম মুক্তির সিদ্ধান্তে পরিবার সন্তুষ্ট নয়। তবে তাদের ক্ষোভের মূল কারণ, হত্যার দায়ে গাইগারকে মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনি যেন পুরো সাজা ভোগ করেন।
মেরিট বলেন, গাইগারের সম্পূর্ণ সাজা ভোগের পক্ষেই ছিল পরিবার। যদিও আগাম মুক্তি ঠেকানো সম্ভব হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা তাদের কাছে ছিল না। তার মতে, সাজা ঘোষণার সময় থেকেই পরিবারের হতাশার শুরু।
গাইগারের আইনজীবী রবার্ট এল রজার্স এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারেননি। তবে চলতি মাসে ডালাসের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে তিনি জানিয়েছিলেন, মুক্তির পর গাইগারের থাকার জায়গা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। কারাগারে থাকাকালে তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি করেন তার আইনজীবী।
২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে নিজের বসার ঘরে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন এবং আইসক্রিম খাচ্ছিলেন বোথাম জিন। অভিযোগপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পড়েন গাইগার।
জিনের অ্যাপার্টমেন্টটি ছিল গাইগারের নিজের বাসার ঠিক এক তলা ওপরে। ঘটনার সময় ডালাস পুলিশ বিভাগে চার বছর ধরে কর্মরত গাইগার ইউনিফর্ম পরা থাকলেও দায়িত্বে ছিলেন না।
আদালতে গাইগার জানান, ভুল তলায় গাড়ি পার্ক করার কারণে তিনি জিনের অ্যাপার্টমেন্টকে নিজের বাসা ভেবেছিলেন। চাবি দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলে সেটি খুলে যায়। ভেতরে জিনকে দেখে তাকে চোর মনে হয়েছিল এবং নিজের জীবন রক্ষার আশঙ্কা থেকে তিনি গুলি চালান বলে দাবি করেন গাইগার।
গুলিতে নিহত হন বোথাম জিন। এ ঘটনার পর গাইগারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্য, পুলিশের আচরণ ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও বিক্ষোভের জন্ম দেয়। গাইগার শ্বেতাঙ্গ এবং জিন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ।
বিচার চলাকালে গাইগার ক্ষমা চান। সে সময় জিনের কিশোর ভাই ব্র্যান্ডট জিন তাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
টেক্সাসের ক্ষমা ও প্যারোল বোর্ড গত ১ অক্টোবর গাইগারের প্যারোলের আবেদন অনুমোদন করে। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তার প্যারোলের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
বোর্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, কারাগারে গাইগারের আচরণ সন্তোষজনক ছিল। মুক্তির পর পূর্ণকালীন ও স্থায়ী চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি সহিংসতা বা হামলার ধারাবাহিক গ্রেপ্তার কিংবা দণ্ডের কোনো নথি না থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে গাইগারের মুক্তির বিরোধিতা করেছিল ডালাস কাউন্টির অ্যাটর্নি কার্যালয়। তবে এবার এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। ডালাস পুলিশ বিভাগও নতুন করে মন্তব্য না করে তাদের আগের বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, গাইগারের মুক্তির সিদ্ধান্ত বোথাম জিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর স্মৃতি ও সংশ্লিষ্ট আবেগ নতুন করে সামনে আনতে পারে। একই সঙ্গে জিনের পরিবার এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিল পুলিশ বিভাগ।
অন্যদিকে, পরিবারের আইনজীবী মেরিটের মতে, গাইগার এখনো সমাজের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারেন। তার যুক্তি, আদালতে গাইগার নিজের পুলিশি প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তার কর্মকাণ্ডকে ন্যায্য বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এমন মনোভাব উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন মেরিট।
গাইগারের মুক্তির খবর প্রকাশের পর বোথাম জিন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তার পরিবার ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ার বাসিন্দা বোথাম জিন ডালাসে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ২০২১ সালে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলসংলগ্ন সড়কটির নাম পরিবর্তন করে ‘বোথাম জিন বুলেভার্ড’ রাখা হয়। ওই এলাকাতেই ডালাস পুলিশের সদর দপ্তর অবস্থিত।
সান নিউজ/ রাব্বি