গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আপত্তি ও অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও দেশটির প্রত্যন্ত পূর্বাঞ্চলে তেল অনুসন্ধানের জন্য কূপ খননের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মার্কিন কোম্পানি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের জেমসন ল্যান্ড এলাকায় ইতোমধ্যে তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম নামানো হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়াই সরঞ্জাম নামানোর অভিযোগ
খননকাজের সরঞ্জাম নামানোর ঘটনায় গ্রিনল্যান্ড সরকার কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, এসব সরঞ্জাম নামানোর জন্য কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে যেকোনো কারিগরি বা কার্যক্রম শুরুর আগে খনিজ সম্পদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে।
গত বছর প্রতিষ্ঠিত মার্কিন কোম্পানি ‘গ্রিনল্যান্ড এনার্জি’ দাবি করেছে, জেমসন ল্যান্ডের ভূগর্ভে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেল থাকতে পারে। সম্ভাব্য মজুত যাচাই করতে কোম্পানিটি দুটি কূপ খননের জন্য প্রায় ৬ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল।
তবে পরে শেয়ারহোল্ডারদের জানানো হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে একটি কূপ খনন করা হবে।
তেল উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা
পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে গ্রিনল্যান্ড ২০২১ সালে নতুন তেল উত্তোলনের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে ‘৮০ মাইল’ নামের একটি ব্রিটিশ কোম্পানি জেমসন ল্যান্ডে তেল অনুসন্ধানের অধিকার পেয়েছিল।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির নথি অনুযায়ী, অনুসন্ধান কার্যক্রমে অর্থায়নের বিনিময়ে কোম্পানিটি ওই প্রকল্পে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা বা অংশীদারিত্ব নেবে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গ্রিনল্যান্ড সরকারের অনুমোদন এখনো প্রয়োজন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের সম্পৃক্ততা
প্রকল্পটিতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড এনার্জি ‘ডক্টর ফিল’ নামে পরিচিত ফিল ম্যাকগ্রকে নিয়োগ দিয়েছে। সাবেক এই টেলিভিশন উপস্থাপক ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাকে দিয়ে আধুনিক যুগের তেল অনুসন্ধানকারীদের অভিযান নিয়ে একটি তথ্যচিত্র সিরিজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কোম্পানিটি পরিচালক হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক এক সদস্যকে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণকে এই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ট্রাম্প।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির চেয়ারম্যান ও অন্যতম প্রধান শেয়ারহোল্ডার ল্যারি সোয়েটসেরও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়। তেল প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো সম্পর্ক নেই বলে সোয়েটস দাবি করেছেন।
সরঞ্জাম পৌঁছানো নিয়ে বিভ্রান্তি
চলতি বছরের জুনে জেমসন ল্যান্ডের স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি সভায় কোম্পানির এক প্রতিনিধি ভুল করে দাবি করেছিলেন, খননযন্ত্র নামানোর অনুমতি তাদের রয়েছে। পরে সোয়েটস বলেন, প্রকল্পটির প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে তারা এমনভাবে কথা বলেছিলেন, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
এর পরের মাসে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি টাগবোটকে বার্জ টেনে তীরে নিয়ে আসতে এবং বেশ কয়েকটি কনটেইনার নামাতে দেখেন। গ্রিনল্যান্ড সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত তেল অনুসন্ধানমূলক খননকাজের জন্য এসব সরঞ্জাম স্থলভাগে নেওয়া হয়েছিল।
ডেনমার্কের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্যানওয়াচ শিপিং কোম্পানির প্রধানকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, চালানটি গ্রিনল্যান্ড এনার্জির জন্য পাঠানো হয়েছিল। এ বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানের প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কোম্পানিটি।
তবে শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গ্রিনল্যান্ড এনার্জি জানিয়েছে, প্রকল্পের নেতৃত্ব ও গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতিতে তারা আশাবাদী।
জটিল অবস্থানে গ্রিনল্যান্ড
ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে। ফলে তেল অনুসন্ধানের অনুমোদন দেওয়া বা প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে।
তবে প্রস্তাবিত কূপগুলোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রামসার কনভেনশনের আওতাভুক্ত একটি সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকল্পের অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করলে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিজের চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরঞ্জামগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবি করা এখন ‘যৌক্তিক বা সামঞ্জস্যপূর্ণ’ হবে না। তবে প্রকল্পটির অনুমোদনের আবেদন বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খননযন্ত্রসহ প্রায় ৩০০টি শিপিং কনটেইনার বহনকারী একটি জাহাজ ১২ সেপ্টেম্বর কানাডা থেকে রওনা হওয়ার কথা। এরপর অক্টোবরে কূপ খননের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, লুইজিয়ানার কট্টর-ডানপন্থী গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি, যিনি ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, দাবি করেছেন আগামী বছরই গ্রিনল্যান্ডে তেল উত্তোলন শুরু হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
সান নিউজ/ জামান