একজন সহকর্মীর ‘চোখ ওঠা’ বা কনজাংটিভাইটিস শুধু তার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি পুরো অফিসের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় একই পরিবেশে কাজ করা এবং ডেস্ক, কিবোর্ড, মাউস, টেলিফোন, প্রিন্টার, কনফারেন্স রুমসহ বিভিন্ন জিনিস ভাগাভাগি ব্যবহারের কারণে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে এই রোগ।
স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মেনে না চললে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে খুব দ্রুত অন্যদের শরীরে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সঙ্গে আলাপকালে ভারতের শারদাকেয়ার-হেলথসিটির অফথালমোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. পনিন্দর কুমার ডোগরা জানান, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠা অত্যন্ত ছোঁয়াচে। সাধারণত সংক্রামিত হাত, ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং চোখের তরলের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোখ ওঠা মৃদু মাত্রার হয় এবং সঠিক চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি না জেনেই অল্প সময়ের মধ্যে অনেক সহকর্মীকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।
চোখ ওঠা বা কনজাংটিভাইটিস কী?
চোখের সাদা অংশ এবং চোখের পাতার ভেতরের পাতলা স্বচ্ছ পর্দাকে কনজাংটিভা বলা হয়। এই পর্দায় প্রদাহ সৃষ্টি হলে চোখ লাল বা গোলাপি হয়ে যায়, যা সাধারণভাবে ‘চোখ ওঠা’ নামে পরিচিত।
চোখ ওঠার প্রধান কারণগুলো হলো—
-
ভাইরাসের সংক্রমণ
-
ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
-
অ্যালার্জি
-
ধোঁয়া, ধুলাবালি বা রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব
ডা. ডোগরা জানান, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠা সাধারণত ছোঁয়াচে হলেও অ্যালার্জির কারণে হওয়া চোখ ওঠা অন্যের মধ্যে ছড়ায় না।
অফিসে যেভাবে ছড়ায় চোখ ওঠা
অফিসের শেয়ার করা পরিবেশ জীবাণু ছড়ানোর জন্য উপযোগী। আক্রান্ত ব্যক্তি চোখে হাত দেওয়ার পর কিবোর্ড, মাউস, টেলিফোন, দরজার হাতল বা লিফটের বোতাম স্পর্শ করলে সেখানে জীবাণু থেকে যেতে পারে। পরে অন্য কেউ সেই স্থান স্পর্শ করে নিজের চোখে হাত দিলে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়া যেসব মাধ্যমেও ছড়াতে পারে—
-
তোয়ালে বা রুমাল ভাগাভাগি করলে
-
একই টিস্যু একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে
-
চোখের প্রসাধনী শেয়ার করলে
-
কন্ট্যাক্ট লেন্সের কেস বা আনুষঙ্গিক জিনিস ভাগ করলে
-
কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বের হওয়া জলকণার মাধ্যমেও
চোখ ওঠার সাধারণ লক্ষণ
চোখ ওঠার লক্ষণ এক বা উভয় চোখেই দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
-
চোখ লাল বা গোলাপি হয়ে যাওয়া
-
অতিরিক্ত পানি পড়া
-
চুলকানি ও জ্বালাপোড়া
-
চোখে কিছু আটকে থাকার অনুভূতি
-
চোখের পাতা ফুলে যাওয়া
-
চোখ থেকে পিচ্ছিল বা আঠালো তরল বের হওয়া
বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠায় চোখ থেকে হলুদ বা সবুজ রঙের ঘন তরল বের হতে পারে। এতে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের পাতা আটকে যেতে পারে।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়া পর্যন্ত অফিসে না যাওয়াই ভালো।
অফিসে চোখ ওঠার সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায়
১. নিয়মিত হাত ধোয়া
সংক্রমণ ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো হাত পরিষ্কার রাখা। অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। প্রয়োজনে অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
২. চোখে হাত দেওয়া এড়িয়ে চলা
অফিসের বিভিন্ন জিনিস স্পর্শ করার পর চোখ ঘষা বা স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা
কিবোর্ড, মাউস, ফোন, টেবিল, দরজার হাতল ও লিফটের বোতামের মতো নিয়মিত ব্যবহৃত জিনিস পরিষ্কার রাখা জরুরি।
৪. ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার না করা
তোয়ালে, প্রসাধনী, আই ড্রপ, কন্ট্যাক্ট লেন্স ও টিস্যুর মতো ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ভাগ করা উচিত নয়।
৫. আক্রান্ত হলে বিশ্রামে থাকা
ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠা হলে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে থাকা উচিত, যাতে অন্যরা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে বাঁচেন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—
-
চোখে তীব্র ব্যথা হলে
-
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা বা কমে গেলে
-
আলো সহ্য করতে সমস্যা হলে
-
চোখের চারপাশ অতিরিক্ত ফুলে গেলে
-
চিকিৎসার পরও সমস্যা বাড়তে থাকলে
ডা. পনিন্দর কুমার ডোগরার মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা এবং সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে অফিসে চোখ ওঠার সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সান নিউজ/ হুমায়রা